পুরোনো ফিল্ম

তপন সিনহা পরিচালিত ‘হাটে বাজারে’ নিয়ে আলোচনা- ‘Hatey Bajarey’

১৯৬৭ সালে তপন সিংহ পরিচালিত ‘হাটে বাজারে’ ছবিটি বেস্ট ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। বনফুল রচিত ‘হাটে বাজারে’ উপন্যাসকে নিয়েই ছবি। বড়লোক ও প্রভাবশালী ছবিলালের ছেলে লাছমানলালের সাথে গরীবের ভগবান এবং আদর্শ ব্যক্তিরূপে পূজ্য ডাক্তার অনাদি মুখার্জির বিবাদ কিভাবে দানা বাঁধে এবং তা কিভাবে পরিসমাপ্তি পায় তা নিয়েই এই সিনেমা। ছবিটি produce করেছেন অসীম দত্ত cinematography করেছেন দীনেন গুপ্ত। অশোক কুমার, বৈজয়ন্তীমালা, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু বন্দোপাধ্যায় সম্বলিত এই ছবি ওই বছরের বাণিজ্য সফল ছবিগুলির মধ্যে একটি।

‘হাটে বাজারে’ ছবির প্লটকে তপন সিনহা ছবি শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বুঝিয়ে দিয়েছেন দুটি ভিন্ন ধারার চরিত্র ও ঘটনার উপস্থাপনের মাধ্যমে। ছবির প্রথমেই ছবির ভিলেন লছমানলাল (অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়) কে দেখা যায় ঘোড়ার পিঠে চেপে একটি মেয়েকে ধরে রেপ করতে উদ্যত। ওই একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে লছমানলালের চরিত্র কেমন হতে চলেছে তার একটি আউটলাইন এঁকে দেন পরিচালক। আবার তার পরের sequence যেখানে ড্রাইভার আলীকে নিয়ে ডাক্তার অনাদি মুখার্জি (অশোক কুমার) বাজারে গেছেন এবং সেখানে গরিব লোকেরা তাকে ডাক্তার বাবু বলে সম্বোধন করছেন। যদিও তিনি বাজার করতে যাননি। সকালে বাজার করে নিয়ে যাওয়া পচা মাছের প্রমাণ নিয়ে সেই মাছ বিক্রেতাকে উচিত শিক্ষা দিতে এসেছেন তিনি। কিছু পরে সেই মাছ বিক্রেতা জগদম্বাকে (পুরুষ) ধরে নিয়ে আসে আলী এবং তারই পচা মাছ তাকে খাইয়ে ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন এমন পচা মাছ সে তাকে দিয়েছে কেন? কিন্তু জগদম্বা জানায় তার মেয়ের শরীর ভালো নয়, তাই তার কাজে মন ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের রাগ পড়ে যায় এবং জগদম্বার মেয়েকে দেখতে তিনি চলে যান আলোর গুদামের মধ্যে। একটি ছোট খাটিয়ায় শুয়ে থাকা জগদম্বার মেয়েকে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই তাকে দেখতে শুরু করেন ডাক্তার অনাদি মুখার্জি। তিনি আদর করার ছলে বাচ্চা মেয়েটিকে দেখেন এবং ওষুধ লিখে দেন। এই ঘটনা থেকেই আমরা বুঝতে পারি ডাক্তার অনাদি মুখার্জি একজন এমন মানুষ যিনি কেউ ভুল করলে তাকে যেমন শাসনও করেন আবার তার বিপদে সমস্ত কিছুকে তুচ্ছ করে সবার আগে এগিয়েও যেতে পারেন। তাই তিনি গরিব মানুষের কাছে ভগবান তুল্য ‘ডাক্তারবাবু’।

তারপরের shot এই আবার আমরা দেখতে পাই লছমানলাল কে। wide shot এ মেখে ঢাকা আকাশের নিচে সরু মালভূমি অঞ্চলের রাস্তার মধ্যে দিয়ে জোর গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে সে। শত এবং settings সঙ্গে Background music বুঝিয়ে দেবে ডাক্তারি মুখার্জি যতটা ভালো মানুষ বা ‘Good’ লছমানলাল ঠিক ততটাই খারাপ, শয়তান বা’evil’। এবং এখান থেকেই বোঝা যায় ছবিতে মুখ্য বিষয়ে থাকতে চলেছে ‘Good vs Bad’।

এরপরের টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্যে দিয়ে পরিচালক ডাক্তার অনাদি মুখার্জির চরিত্র, মানসিকতা ও তার জীবনধারা সম্বন্ধে বেশ খানিক তথ্য দেন। বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে তার দেখা হয় হাইকোর্টের রিটায়ার্ড সাব যাওয়ার নোটনবিহারী বাবুর(রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত)সঙ্গে। তার সঙ্গে সখ্যতা মূলক আচরণ ও হাসিঠাট্টা করতে করতে তিনি বাড়ি পৌঁছে যান। সেখানে বাড়ির মুখেই বাগানের মধ্যে আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছে নানি(ছায়া দেবী)। নানীর চোখে ছানি পড়েছে সেই ছানি কেটে দিতে হবে ডাক্তার বাবুকে। শুধু চোখের অসুখই নয়, তার নাতি তাকে মারধর করছে, সেই সমস্যা ও ডাক্তার বাবুকেই ঠিক করে দিতে হবে। ডাক্তারবাবুর কোনো কথাতেই না নেই। আলীকে বললেন তার নাতিকে হাসপাতালে ধরে আনতে। ঘরে পৌঁছানোর পরই তিনি খেতে বসলেন। তার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা খুনসুটির মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারবো তার স্ত্রী কঠিন হৃদরোগের ব্যারামে ভুক্তভোগী যা তার কোনদিনই সারবে না। খাওয়ার মাঝে ডাক্তার বাবুকে ফোন করেন পুলিশের বড় কর্তা মিস্টার পান্ডে তার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। এই টুকরো টুকরো ঘটনা গুলি থেকে আমরা ডাক্তারবাবুর ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে খানিক তথ্য পাই। গরিব , আদিবাসি,সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সবার সঙ্গে ডাক্তারবাবুর সখ্যতা এবং অবাধ বিচরণ সম্পর্কে জানতে পারি।

মিস্টার পান্ডের স্ত্রীকে ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করতে যান। মিসেস পাণ্ডের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমরা ডাক্তারবাবুর ডাক্তারি গুণের পরিচয় পাই। কিভাবে ওষুধ ছাড়াও মানুষের সাথে শুধু কথা বার্তার মধ্যে দিয়ে রোগীর মনের ভিতর ঢুকে পড়ে রোগীর রোগকে অর্ধেক সারিয়ে তোলার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ডাক্তারবাবুর, যা আমরা জগদম্বার মেয়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দেখতে পেয়েছিলাম।

এরপরের দৃশ্য শুরু হয় এই ছবির আরেক প্রধান অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালাকে দিয়ে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীদের মধ্যে তিনি একজন। তৎকালীন বলিউড রূপসী তিনি। ‘হাটে বাজারে’ বৈজয়ন্তী মালার প্রথম বাংলা ছবি। যদিও এই ছবিতে তাকে দেখা যাচ্ছে অতি সাধারণ কাপড়ে দরিদ্র আদিবাসী বিধবার চরিত্রে। যদিও তার পরনের সাদা থান নেই, তার বয়স খুবই কম, খুব অল্প বয়সেই তার স্বামী মারা গেছে, আর সে বাঙালিও নয়। তার এক ভাই আছে শিবু সে বাঙালি কারণ সে তার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। ওষুধের দোকানদারের সাথে খুনসুটি এবং কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে আমরা ছিপলির সম্বন্ধে জানতে পারি আর ঠিক এই সময় ছবিতে আবারও আগমন ঘটে ভিলেন লছমানলালের।

“কাকে পটকে দিলি রে ছিপলি?…হুম কাকে পটকান দিলি… ছিপলি?” ছিপলি কোনোভাবে তাকে এড়িয়ে সেই জায়গা পরিত্যাগ করে। কিন্তু ওই অংশে লাছমানলালের কথাবার্তা চোখের চাহনি দিয়ে পরিচালক পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন যে এবার লাছমান মনে মনে ছিপলিকে চাইতে শুরু করেছে। আর এটি ছবির মূল conflict point হয়ে দাঁড়ায় এবং এর সঙ্গে পরবর্তীকালে জুড়ে যান ডাক্তার অনাদি মুখার্জি।

এরপর আমরা নানা ছোটখাটো ঘটনা দেখতে পাবো যেমন শিবুকে চোর হিসেবে লাছমানলালের ফাঁসানোর ঘটনা। অসহায় ছিপলি ছুটে আসে ডাক্তারবাবুর কাছে। ডাক্তার বাবু তার ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে শিবুকে ছাড়িয়ে দেন। এরপর নটু বাবুর সাথে তৎকালীন বাংলা সমাজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যা ছবির গল্পকে খানিকটা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তার লক্ষ্যের দিকেও এগোতে থাকে। লাছমানলাল নানাভাবে ছিপলিকে বিরক্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ছবিলালের বাড়িতে পার্টির দৃশ্য।

ছবিলাল ওই অঞ্চলের অত্যন্ত বিত্তবান ও প্রভাবশালী লোক হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তারা তাকে পছন্দ না করলেও তার পার্টিতে আসতে বাধ্য হয়।। এই পার্টিতে ডাক্তারবাবুও আসেন। কারণ সরাসরি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে লাছমানলালের শত্রুতা তখনও শুরু হয়নি আর ওই অঞ্চলের সিভিল সার্জেন্ট হওয়ার দরুন ছবিলালও তাকে বেশ খাতির-টাতির করেন। এই দৃশ্যের ডাক্তারবাবুর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দু চারজন প্রতিবেশী নিজেদের মধ্যে সমালোচনা করতে আরম্ভ করেন। ডাক্তারবাবু চরিত্র সম্পর্কে বদনাম করতে থাকেন। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ডাক্তার অনাদি মুখার্জি গরিবের কাছে ভগবান বলেই হয়তো তার সমগোত্রীয়রা অনেকেই তাকে পছন্দ করতে পারেন না বা হিংসা করেন। আবার ডাক্তারবাবুর শুভাকাঙ্ক্ষী ও আছেন যেমন ম্যাজিস্ট্রেট সাব, মিস্টার পান্ডে। আবার এখানে ছবি লালের চরিত্র সম্বন্ধেও দর্শক অনেক কিছু বুঝতে পারেন। তিনি ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করেন অকারনে হাসপাতালের বর্তমান ওষুধ সাপ্লাইয়ারদের নামে দোষ চাপিয়ে সেই অর্ডার তাকে পাইয়ে দেওয়া হোক।। স্বভাবতই হাসির মধ্যে দিয়ে ডাক্তার বাবু অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। গোটা সিনেমা জুড়েই তাকে সব সময় হাসিমুখে বিপদকে সামলাতে দেখা যায়। ঠিক এর পরই লাছমালালের একটি মনোলোগ শুনতে পাওয়া যায়। এই অংশটি শুধু তার চরিত্র খারাপ এমনটাই প্রমাণ করে না সঙ্গে সে যে অলস, কুড়ে এবং বাপের টাকা নয় ছয় করতে ওস্তাদ তারও প্রমাণ রাখে। এই দৃশ্যে লাচ্মান লালের চরিত্র অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় অসাধারণ এবং মনে রাখার মত।

(continue পরবর্তী অংশে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *