পুরোনো ফিল্ম

‘পাতালঘর'(Patalghar) ২০০৩ সালে তৈরি হওয়া অনবদ্য একটি চলচিত্র

পাতালঘর

The Underground Chamber

একটা সময় বাংলা চলচ্চিত্রে কিছু বিশ্বমানের ছায়াছবি তৈরি হতো। তাদের যেমন থাকতো বিশ্বমানের অভিনয় তেমনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালকদের নির্দেশনায় তৈরি সেসব ছবির টেকনিক্যাল দিকগুলি ছিল চোখ ধাঁধানো। ছবির লাইটিং, ক্যামেরা, সেট, প্রপস, সাউন্ড, মিউজিক সবেতেই ভারতবর্ষের অন্য যে কোন চলচ্চিত্রের তুলনায় অনেকখানি এগিয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্র।কিন্তু সময় স্রোতের মতো আর সেই স্রোতের সাথে হারিয়ে যায় অনেক কিছু। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ছবির মান পড়েছে, ব্যবসা কমেছে, কমেছে কুশীলবদের দক্ষতা। ১৯৯০ থেকে ২০০০ দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বত্র অবনতি ঘটেছে। এবং সেই অবনতির স্রোত গড়িয়েছে আরও ২ দশক পর্যন্ত এবং খরা এখনও কাটেনি। চলছে। কিন্তু এর মাঝেও মরুভূমিতে থাকা ওয়েসিসের মতো বাংলা চলচ্চিত্রেও এসেছে কিছু বিশ্বমানের কাজ, নজর কেড়েছে ছবির সকল দিক, পেয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভাগে পুরস্কার। তেমনি একটি ছবি হল ‘পাতালঘর'(২০০৩)।

‘পাতালঘর’ ছবিটি মুক্তি পায় 2003 সালে। বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাতালঘর’ নামের সাইন্স ফিকশন গল্পের এডাপটেশনে ‘পাতালঘর’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন অভিজিৎ চৌধুরী, মিউজিক দিয়েছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন অভিক মুখোপাধ্যায়। ছবিতে রয়েছেন একাধিক ভালো অভিনেতারা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, খরাজ মুখোপাধ্যায়, সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়, জয় সেনগুপ্ত, কেতকী দত্ত, মিতা বশিষ্ট, রমাপ্রসাদ বণিক, মনু মুখার্জি, বিপ্লব চ্যাটার্জি প্রমুখ করা। ছবিটিতে যেমন রয়েছে ভরপুর আর্ট, তেমনি রয়েছে দেদার এন্টারটেইনমেন্ট। এবং ৮ থেকে ৮০ সকলের একসঙ্গে বসে দেখার মত বাঙালিয়ানায় ভরপুর ছবি হল এই ‘পাতালঘর’।

প্লট:

চলচ্চিত্রে যে বর্তমান সময়ের কথা বলা হয়েছে তা থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে অঘোর সেন নামের এক বিখ্যাত বাঙালি বৈজ্ঞানিক যিনি নিজের অসামান্য প্রতিভার জোরে কয়েকটি আদিম শব্দ দিয়ে এমন একটি যন্ত্র বানিয়েছিলেন যা দিয়ে যেকোনো প্রাণীকে বেশ কিছুদিন ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু এই আশ্চর্য যন্ত্রের কথা জানতে পেরে যায় পৃথিবীর বাইরের একটি গ্রহ ন্যাপচা এবং তার এক অদ্ভুত দর্শন প্রাণী ভিখ। সে যন্ত্রবিজ্ঞানে যথেষ্ট উন্নত এবং সে তার নিজস্ব যানে করে ওই যন্ত্রটি হাতাতে পৃথিবীতে আসে। অঘোর সেনের পিসিমা ওই বাজনাটি বাজিয়ে ভিখকে ঘুম পাড়িয়ে দেন। দেড়শ বছর ধরে ঘুমায় সে।

প্রেজেন্ট ডে তে দেখানো হচ্ছে অঘোর সেনের পার্সোনাল ডাইরি হাতে পড়েছে ডক্টর ভূতনাথ নন্দী নামক একজন তরুণ বৈজ্ঞানিকের। যিনি একটি বিজ্ঞান সভায় অঘোর‌ সেনের অদ্ভুত বাজনার ডেসক্রিপশন দিচ্ছেন এবং সেই বাজনাটিকেও তিনি নিজের খোঁজার চেষ্টা চালানোর কথা বলছেন। কিন্তু ঘটনা ক্রমে একটি gang বা বাহিনী যারা অস্ত্র নিয়ে কারবার করে, পৃথিবীর সমস্ত ভয়ংকর অস্ত্র যাদের কাছে মজুত আছে, তাদের কাছে এমন যন্ত্রের খবর চলে যায়। সেই দলের সর্দার হলেন বেগম(মিতা বশিষ্ট)। তিনি তার কিছু লোককে লেলিয়ে দেন ডক্টর ভূতনাথ নন্দীর পিছনে এবং তাকে ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে যন্ত্র টা বেগমের হাতে তুলে দিতে বলা হয়। জানা যায় যন্ত্রটা আছে অঘোর সেনের ল্যাবরেটরি পাতালঘরে যা অবস্থিত নিশ্চিন্দিপুর নামে এক গ্রামে।

এই গ্রামেরই অঘোর সেনের বাড়িতে আগমন ঘটে আরও দুইজনের। সুবুদ্ধি ও কার্তিকের। কার্তিক বোস হল অঘোর সেনের বাড়ির উত্তরাধিকার। উকিলের চিঠি পেয়ে তারা আসে তাদের পৈতৃকর বাড়িতে যা তারা এতদিন জানতো না। সুবুদ্ধি এই গ্রামে এসে থিয়েটার নাটক নিয়ে মেতে যায় গ্রামে আসেন ভূতনাথ নন্দী ও এবং বেগমের লোকজন আবার এই সময় দেড়শো বছর পরে জেগে ওঠে ভিখও ভিক ঘুম থেকে উঠেই উঠে পড়ে লাগে যন্ত্র টা খুঁজে পাবার জন্য।

এই সময় সিরাজউদ্দৌলা নাটকের জন্য একটি মহম্মদী বেগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুবুদ্ধি হঠাৎ দেখতে পায় জঙ্গলের মধ্যে ভিখকে এবং ভিখ বলে যে সে করবে কিন্তু তাকে অঘোরের বাজনা এনে দিতে হবে।

ভুতনাথের সাথে গভীর বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় কার্তিকের। অঘোর সেনের ডাইরিতে থাকা একটি হেঁয়ালির সন্ধান করতে পারলেই সন্ধান পাওয়া যাবে পাতালঘরের। এক সময় তারা দুজন মিলে হেঁয়ালির উদ্ধার করেও ফেলে এবং গল্প উপস্থিত হয়ে ক্লাইম্যাক্সে।

টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট:

এই চলচ্চিত্র ন্যাশনাল আওয়ার্ড জেতে সিনেমাটোগ্রাফি বিভাগে। সিনেমাটোগ্রাফি অর্থাৎ ক্যামেরা আলোর সব মিলিয়ে যে ব্যাপারটা। এই কাজটা করেছেন অভীক মুখার্জী। তার কাজ যে কতটা অসাধারণ হয়েছে তা সিনেমার প্রতিটা ফ্রেমে ধরা পড়বে। অসাধারণ লাইটিং এর কাজ রয়েছে সিনেমা জুড়ে এবং পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে ছবি হলো এই ‘পাতালঘর’। পাতালঘরে অঘোর সেনের এর ল্যাবরেটরিতে এক রকম লাইটিং, তার সেটের কাজও দুর্দান্ত – সব মিলিয়ে যাকে বলে মিজ অন সিন দুর্দান্ত। আবার বেগমের রাজসভায় ব্লু অরেঞ্জের লাইটিং এর সংমিশ্রণের মধ্যে দিয়ে বেগমকে একরকম comic evil টাইপের চরিত্র দেয়া হয়েছে। সুবুদ্ধি ও কার্তিকের ঘরের সেট ডিজাইন এবং লাইটিংও অসাধারণ। ছবিতে ‘অস্তর অস্তর’ বলে একটি গান রয়েছে। সেটা দুর্দান্তভাবে শুট করা হয়েছে। ছবিতে ভিখ হলো গিয়ে যাকে বলে প্রধান ভিলেন। লাইটিং, মেকাপ ও প্রপসের মাধ্যমে তাকে যেভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে তা দেখবার মতো। ভিখের আকাশযানটির সেট ডিজাইন অনবদ্য, নিখুঁত। আসলে ছবিটিকে যেভাবে ডিজাইন করা হয়েছে কোনভাবেই দেখে একটি নিরীহ বাঙালি ছবি বলা যাবে না। প্রত্যেকটি জিনিসের মধ্যে রয়েছে নিখুঁত পরিবেশনা।

ছবির সাউন্ড এবং মিউজিকের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ভিখ এবং তার সঙ্গে কথা বলা কম্পিউটারের মাথার কথোপকথন সিনের সাউন্ড ডিজাইন যথেষ্ট নিখুত। ছবির গানগুলো নিখাদ বাঙালিয়ানায় ভরপুর। ‘যে কোন ভূমিকায়’ এবং ‘কাশি যেতে পারো, যেতে পারো গয়া’ এই ছবির খুবই বিখ্যাত দুটি গান। অঘোর সেনের লিপে গাওয়া একটি গান যা গেয়েছেন শ্রীকান্ত আচার্য তার মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টও অসাধারণ। ছবির সাউন্ড এবং মিউজিক সামলেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। অঘোর সেনের বাজনার সাউন্ড ডিজাইনও খুব সুন্দর করে ডিজাইন করা হয়েছে। ভিখের গাওয়া গানটিও দুর্দান্ত।

অভিনয়:

ছবির গল্প, টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট সমস্ত কিছু নিখুঁত থাকলেও দর্শকদের তখনই সেটা ভালো লাগবে যখন দক্ষ কলাকুশলীরা তাকে অভিনয়ের মাধ্যমে সুন্দর করে দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। এই ছবিতে একাধিক দক্ষ অভিনেতা অভিনেত্রীরা রয়েছেন যারা প্রত্যেকেই নিজে নিজে জায়গায় একেবারে যথাযথ। তবে বিশেষ করে বলতে হয় বিপ্লব চ্যাটার্জির কথা। বাংলা ছায়াছবিতে একচেটিয়া খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করার পর একটি অন্য গ্রহের প্রাণীতে পরিণত হয়ে তাকে দারুন ভাবে ফুটিয়ে তোলা প্রশংসার তো বটেই, অবাক হওয়ার বিষয়ও। বিশেষত তার ম্যানারিজম ছিল দেখবার মতো। পুনে থেকে বিশেষ মেকআপ টিম ছিল তাকে প্রস্তুত করার জন্য। আর বলতে হবে সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা অর্থাৎ কার্তিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন যে। ওইটুকু ছেলে পাল্লা দিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, খরাজ এদের পাশাপাশি দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। তার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন গুলো দেখার মত ছিল। জয় সেনগুপ্ত যথাযথ। মিতা বশিষ্ট্য দারুন ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন বেগমের চরিত্রে। খরাজ ফাটাফাটি। আর সবার উপরে ছাতা হয়ে প্রকৃত প্রবীণ অভিনেতার মতো অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওরফে অঘোর সেন।

রবিবার দুপুরে বাড়ির সকলের সঙ্গে বসে বিশেষত বাচ্চাকাচ্চাদের সঙ্গে নির্ভেজাল বাঙালিয়ানার আনন্দ উপভোগ করার জন্য ” ছবিটি অবশ্যই দেখা উচিত সকলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *