ফিল্মি পার্সোনালিটি

A brief article on Ajitesh Bandyopadhay: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়

Interesting facts about Ajitesh Bandyopadhay

Bangla Natok Ajitesh Bandyopadhay

“হি ওয়াজ আ জায়ান্ট এমং আস” বলেছেন বন্ধু রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। সত্যিই তিনি জায়ান্ট। সাড়ে ছয় ফুট লম্বা, রোগাটে গড়ন, মাথা ভর্তি ঝাকরা চুলের এই ব্যক্তির দৈহিক বিশালতা তো ছিলই, কিন্তু প্রতিভার বিশালতা ছিল তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। চরিত্রের অতলে তলিয়ে যাওয়া তার কাছে সহজাত ছিল। রাজনীতি ও ফুটবলের মাঝে তিনি থিয়েটারকেই আমরণ ভালোবেসে গেছেন। আর ভালোবেসেছেন কেয়া চক্রবর্তীকে। বাংলা নাটকের আঙিনাকে ক্রমাগত বৃদ্ধি করে তাকে বিশ্বনাটকের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার কাজটি শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত ছাড়া আরেকজন যিনি সফলভাবে করতে পেরেছিলেন, তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

অধুনা পুরুলিয়া, পূর্বে মানভূম অঞ্চলের রোপো গ্রামে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২০ শে সেপ্টেম্বর বেশ দরিদ্র পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন অজিতেশ। তাঁর বাবা ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কোলিয়ারিতে কাজ করতেন। কুলটি হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করা, আসানসোল কলেজে আই.এ পড়া এবং ১৯৫৭ এ কলকাতার মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র কলেজ থেকে অনার্স সহ বিএ পাস— সবকিছুর মধ্যেও নাটক কে ছেড়ে কিন্তু তিনি থাকেননি। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি অভিনয় করে ফেলেন ‘পি ডব্লউ ডি’, ‘বিংশ শতাব্দী’ নাটকগুলিতে। এরপর ১৯৫৬ তে গণনাট্য সঙ্ঘে যোগদান করেন অজিতেশ। রাজনীতি আর নাটক তার জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। রাজনীতি মানে মারদাঙ্গার রাজনীতি নয়, অজিতেশের বিশ্বাস ছিল মানুষের ভালো করার রাজনীতিতে। কারণ তার কাছে —”ভালো থিয়েটার করতে গেলে ভালো মানুষ হতে হবে। মিথ্যা কথা বলা যাবে না। “

কিন্তু সমস্ত দ্বেষ-দ্বন্দ্বকে সরিয়ে রেখে মনুষ্যত্বের ঝান্ডা তুলে গরীব সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা তো আর চাট্টিখানি ব্যাপার নয়! ঝড় এসেছে আর তাতে অনেকবার ঝুঁকতেও হয়েছে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় কে। সাল ১৯৫৮। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ করবেন বলে ঠিক করলেন অজিতেশ। কিন্তু গোড়াতেই বাধা দিলেন গোঁড়ারা। গোঁড়া কমিউনিস্টরা। কেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন রিয়াকশানিস্ট। তাঁর সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা মেনে নেওয়া যায় না। অজিতেশ যুক্তি দিয়েছিলেন এই নাটকটিতে তো সাধারণ মানুষের কথাই বলা হয়েছে। তবে আপত্তি কোথায়? কিন্তু কমিউনিস্টরা এসব শুনতে রাজি নন। তাই একরকম বাধ্য হয়েই গণনাট্য সংঘ ছেড়েছিলেন অজিতেশ এবং ১৯৬০ এর ২৯ শে জুন অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন মিত্র, অজয় গঙ্গোপাধ্যায়, মহেশ সিংহ, রাধারমন তপাদার, চিন্ময় রায়দের নিয়ে তিনি তৈরি করেন নান্দীকার। পরের বছর যোগ দিলেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। সেই পথ চলা শুরু।

‘নান্দীকার’ পথ চলতে শুরু করলেও শুরুর রাস্তা খুব মসৃণ ছিল না। প্রথম নাটক ছিল ‘বিদেহী'(ইবসেনের ‘ঘোস্টস’। একটি শো এর পর এই বন্ধ হয়ে গেল নাটক। এর পরপর বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করল তারা। কিন্তু বেশিদিন চলতে পারল না কোনটাই। ঠিক সেই সময় হাল ধরলেন রুদ্রপ্রসাদ। মনিন্দ্রচন্দ্র কলেজের স্নাতকের সময় থেকে অজিতেশের সাথে পথ চলা শুরু রুদ্রপ্রসাদের। থিয়েটার কে কেন্দ্রে রেখেই তাদের যত ভাব ভালোবাসা। আবার তর্ক বিতর্কও ছিল। কিন্তু বন্ধুত্বের শিকড় প্রোথিত ছিল অনেক গভীরে। তাই হয়তো দুঃসময়ে পিলার হয়ে দাঁড়ালেন রুদ্রপ্রসাদ। তখন স্কটিশ চার্চের নামজাদা ছাত্র তিনি। এক বন্ধুকে সঙ্গে করে লিখে ফেললেন পিরানদোউলার ‘সিক্স ক্যারেক্টার ইন সার্চ অফ এন অথর’ এর অনুকরণে বঙ্গীয় সংস্করণ ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র’। এই নাটক নান্দীকারের মরা গাঙে জোয়ার নিয়ে এলো। এক বছরে ১৩১টা শো পান তারা। যদিও এ নিয়ে জল ঘোলাও কম হয়নি। সন্তুষ্ট হননি আরেক নাটকবেত্রা উৎপল দত্ত। বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। জলধর সেন নাটক দেখে বলেছিলেন, ”তোদের বাড়িতে মা বোন নেই”। আবার অপরদিকে যারপনাই খুশি এবং আশ্বস্ত হয়েছিলেন নাটক মসীহা শম্ভু মিত্র। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও একাধিক নাটকের বঙ্গীয় করণ করেছিলেন। বাঙালিয়ানার তাঁতে বাংলা সংলাপের সুতোয় বিদেশি চরিত্রকে অনায়াস দক্ষতায় খাঁটি বাঙালির ধাঁচে বুনে ফেলতে পারতেন তিনি।

নাটক তাঁর প্রাণ, কিন্তু সবার আগে তিনি তো অভিনেতা তাই তার তুখোড় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রেও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৫ তে ‘ছুটি’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় তার। কিন্তু তার দুটি চরিত্রকে হয়তো কোনদিনই ভুলতে পারবে না বাঙালি। ‘কুহেলি’ তে সত্যভূষণ এবং ‘হাটে বাজারে’ তে লছমনলাল। শোনা যায় লছমনলাল চরিত্রায়ণ করার জন্য সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। সত্যিই অভিনয় অন্ত প্রাণ ছিল তার।

পয়সা রোজগারের টানে যাত্রাতেও গিয়ে ভিড়েছিলেন তিনি। কিন্তু থিয়েটারী স্টাইলে তার যাত্রা পছন্দ হলো না গ্রামের অতি অভিনয় দেখা দর্শকদের। এক ভদ্রলোক তো অজিতেশের সঙ্গে দেখা করে তাকে বলেই বসলেন যে বিখ্যাত যাত্রা অভিনেতা মোহন চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তিনি যেন সত্বর যাত্রার অভিনয় শিখে আসেন। প্রত্যুত্তরে ১০-১২ রকমের রাবণের হাসি দেখিয়ে ভদ্রলোককে যারপনাই হতভম্ব করে অজিতেশ বললেন, “আমি এসেছি যাত্রার অভিনয়কে বদলাতে।”

না, সর্বত্র হয়তো তার যুক্তি খাটেনি। বরং তিনি নিজেই সরে এসেছিলেন যাত্রার পথ থেকে। তেমনি সমীকরণ মেলেনি সম্পর্কেরও। নিজের কাছের লোকেদের নিয়ে তৈরি ‘নান্দীকার’ থেকেও কোন এক অজানা কারণে বেরিয়ে আসেন তিনি। ১৯৭৭ এ আবার তৈরি করেন ‘নান্দীমুখ’। থামতে হয়তো শেখেননি তিনি। আধো আলো ছায়াতে নাটকের ভালোলাগা, আবেগ আর এক বুক সৃষ্টিশীলতার অক্সিজেন নিয়ে তিনি ক্রমাগত হেঁটে গেছেন ১৯৮৩ দুর্গাষ্টমীর রাতের আগে পর্যন্ত। ‘এই অরণ্য’র দুটি শো করার পর রাতে ফিরে এসে ঠান্ডা রুটি মাংস খান তিনি। মাঝরাতে পেটে ব্যথা শুরু হয়। হজমের গোলমাল ভেবে গুরুত্ব দেননি তিনি। আর সেই কালই অকালে তাকে টেনে নিয়ে চলে গেল। অজান্তে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫০ বছর বয়সে তার জীবন মঞ্চের ওপর পড়লো কার্টেন আর একরাশ অন্ধকার নেমে এলো বাংলা নাটকের মঞ্চে।

One thought on “A brief article on Ajitesh Bandyopadhay: অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *