পুরোনো ফিল্ম

Indian Animation Film ‘Bombay Rose’: ২০১৯ এর ভারতীয় অ্যানিমেশন ফিল্ম ‘বোম্বে রোজ’

সমুদ্র, ফিল্ম সিটি, লোকজনের গাদাগাদি, অনবরত যানবাহন, বস্তি, ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট, পুলিশ, নিষিদ্ধপল্লী, বালির চড়া, স্বপ্ন… মুম্বাই শহর। মুম্বাই কে নিয়ে বিভিন্ন লোকের অনুভব বিভিন্ন। আবার এখানে শ্রেণী কথাটা উল্লেখ করা প্রয়োজনীয়। অর্থের ভিত্তিতেই মানুষ মুম্বাই শহরকে এক এক রকম ভাবে দেখে। কল্পনায় আঁকে তার মানচিত্র। আর এই মানচিত্রকার যদি হন একজন সমাজ- সচেতন ও দক্ষ ফিল্মমেকার, তবে তার ভাবনার পরিসর অবশ্যই অনেক বিস্তৃত। এরকমই একটি বিস্তৃত অনুভব সম্বলিত নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ছবি(অ্যানিমেটেড) হল ‘বোম্বে রোজ'(Bombay Rose)। লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন ভারতীয় থিয়েটার অভিনেত্রী ও পরিচালক গীতাঞ্জলি রাও। ২০১৯ সালে সিনেস্তান কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিটি প্রথম দেখানো হয়েছিল ২০১৯ ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। এছাডাও, সেই বছরই এটিকে প্রদর্শন করা হয়েছিল টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টভ্যালে। প্রাচীন ভারতের মুঘল সংস্কৃতি ও সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনীর যোগসূত্র রেখে সম্পূর্ণ বলিউডি মেলোড্রামার ধাঁচে সমাজের বিভিন্ন অসুখ গুলিকে সুন্দর, সচেতন ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ‘বোম্বে রোজ’ ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন পরিচালক।

মেইন প্লট:
গল্পে অনেক চরিত্র ও অনেক বিষয়কে একসঙ্গে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। গল্পের প্রধান চরিত্র কমলা নামের এক তরুণী যে পেশায় ফুল বিক্রেতা। খুব কম বয়সেই এক বৃদ্ধ লোকের সাথে তার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার দাদু কমলা এবং তার বোন তারাকে সঙ্গে করে নিয়ে মুম্বাইতে পালিয়ে আসে। এখানে এসে তিনি ঘড়ির দোকান খোলেন। এবং ধীরে দুই বোনকে মানুষ করতে থাকেন। কিন্তু হঠাৎই তাঁর অসুস্থতা তাঁকে পঙ্গু এবং কমলাকে গৃহিণী করে তোলে। ঘরের সমস্ত কাজ এবং রোজগার কমলাই করতে শুরু করে। বড়ো হতে থাকে তারা। সে বিদ্যালয়ে ভালো ফল করার পাশাপাশি মিস দিসুজার কাছে ইংরেজি শিখতে থাকে। মিস ডিসুজা ৫০ এর দশকে বলিউডের একজন গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে বয়সকালে তিনি বড়ই একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করতে থাকেন। তার একমাত্র কথা বলার সঙ্গী হল তারা। তাদের কথোপকথন এবং মিস ডিসুজার মৃত স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখানো হয়েছে। এদিকে কমলাও প্রেমে পড়ে সেলিম নামের আরেক ফুল বিক্রেতা ও অনাথ ছেলের। কাশ্মীরে মিলিটারি হামলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মুম্বাই হয়ে ওঠে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই। আরো বিভিন্ন চরিত্রকে বিভিন্ন ট্রোপ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে গল্পে। যেমন কমলার দাদুকে একজন moralist হিসেবে হাজির করা হয়েছে। মিশ্রজী নামের পান বিক্রেতাকে গল্পের বেশ খানিকটা অংশ জুড়েই ন্যারেটারের ভূমিকায় অবতীর্ণ করা হয়েছ। টিপুকে সেন্টিমেন্টাল ক্যারেক্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ট্যাবু গুলোকে দেখানো হয়েছে গল্পে। যেমন, হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে প্রেম, শিশুদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করার ঘটনা, নিষিদ্ধ বারের অস্তিত্ব।

‘বোম্বে রোজ’ অবশ্যই শহরের একটি বিশেষ অংশ ও সেই অংশে বসবাসকারী কিছু মানুষদের একত্রে তুলে ধরে। যদিও গল্পটির মূল প্রটাগনিস্ট একটি নারী চরিত্র — কমলা। কমলার চরিত্রটিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভাবে লেখা হয়েছে। তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়ালগ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তার নিস্তব্ধতা এবং মৌখিক এক্সপ্রেশনই হয়ে উঠেছে ডায়ালগ। এই ছবির পরিচালক অনেক ইন্টারভিউ তেই এই কথা বলেছেন যে, ছবিতে দেখানো কমলা ও সেলিম দুজনকেই তিনি ভেবেছেন বাস্তব চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। আর একথা সত্যি যে, ছবির ট্রিটমেন্ট, কালার টোন, গল্প বলার ধরন, চরিত্রায়ণ, সেট ডিজাইন সমস্ত কিছুই আপনাকে পৌঁছে দেবে বোম্বাই শহরের সেইসব অলিগলির ভিতর, যার গল্প তিনি বলতে চেয়েছেন। শহরের যান চলাচলকারী ব্যস্ত রাস্তার দুধারে গড়ে ওঠা ঝুপড়ির লোকগুলোর কথা, তাদের কঠিন পরিশ্রম, তার ফাঁকেই টুকরো প্রেম, দুঃখ, হতাশা, অবসাদ, আনন্দ, খানিকটা অপূর্ণতা— এইসব নিয়েই অদ্ভুত সুন্দর গল্পের মালা গেঁথেছেন গীতাঞ্জলি রাও।

ছবির ভালো দিক:
ছবির কালার টোন, ব্যকগ্রাউন্ড ও সেট ডিজাইন নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করা উচিত। এক্ষেত্রে পরিচালক নিজেই সমস্ত দায়িত্ব সামলেছেন, তাই সমস্ত প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য। ডেডলাইনকে তাঁর একটি ইন্টারভিউ থেকে জানা যায়, তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবেই orange এবং red এর মধ্যে কালার টোন সেট করেছেন। এই প্যালেটের মধ্যেই রঙের সামান্য পরিবর্তন করে মুম্বাইয়ের সকালের নীলচে ভাব এবং সন্ধ্যার সোনালী ভাবকে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি ফ্রেমেই সেট ডিজাইন দুর্দান্ত, নিখুঁত এবং ডিটেল সম্বলিত। প্রতিটি প্রপস কে সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ফ্রেমগুলিতে। পানের দোকান, ঘড়ির দোকান, হোটেল, বার প্রতিটা ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অ্যানিমেশন করা হয়েছে।
ছবিতে মানুষের মনকে ন্যারেটিভের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ সময়ে মানুষ তার মনের মাধ্যমে কিভাবে তাকে চিন্তা করে, কল্পনার দৌড়ে কতদূর যেতে পারে তাকে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক গীতাঞ্জলি রাও। কমলা ও সেলিমের অনেক প্রেমের দৃশ্যেই তারা কল্পনায় ফিরে যাচ্ছে রূপকথার রাজ্যে বা মুঘল আমলে। দালাল মাইককে ঈগলের প্রতীকে দেখানো হয়েছে। একদা জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিস ডিসুজা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে মুভির কালার সাদা কালোয় পরিণত হচ্ছে। এভাবেই বহু মেটাফরের ব্যবহার করেছেন পরিচালক।

ছবির খারাপ দিক:
তবে ছবির নামে যেহেতু রয়েছে গোলাপ, আর সে গোলাপের কাঁটা থাকবেনা তা কি হয়? রসিকতা নয়, ওই মেটাফোরের ব্যবহারই ছবির অনেক অংশে অতিরিক্ত মাত্রায় হয়ে গিয়েছে। যার ফলে সাধারণ মানুষ এ ছবির মর্ম উদ্ধার তো করতে পারবেনই না, অনেকসময় বরং বোর অনুভব করবেন। ছবিতে এডিটিংয়ের প্রচুর সমস্যা রয়েছে। বারবার transition গাড়ির মাধ্যমে করা হয়েছে, যা একটা সময় পর একঘেয়েমি ধরিয়ে দেয়। অতিরিক্ত সংখ্যায় চরিত্র রাখতে গিয়ে সবাইকে তার চাহিদা অনুযায়ী স্পেস দিতে পারেননি পরিচালক। তাই অনেকক্ষেত্রেই গল্প ঠিক জমাট বাঁধতে পারেনি। ছবিতে শব্দ ও সংগীতের ব্যবহার ভালো। তবে অনেক জায়গাতেই তার অতি ব্যবহার ঘটেছে আবার অনেকক্ষেত্রে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার ঘটেনি।

যদিও সবমিলিয়ে একে কিছুতেই একটি খারাপ ছবি তো বলা চলেই না, বরং সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রোডাকশনে ভারতীয় সংস্কৃতিকে ছবির মূল পুঁজি করে এমন সুন্দর অ্যানিমেশন সিনেমা আমাদের দেশে দুর্লভ। অবশ্যই সকলের এটি দেখা উচিত(নেটফ্লিক্স এ available রয়েছে)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *