ফিল্মি পার্সোনালিটি

‘Mone Pore’ an memoir by Tapan Sinha – তপন সিনহার স্মৃতিকথা ‘মনে পড়ে’

১৯৪৬ সালের শ্রাবনের এক বৃষ্টিঝড়া বিকেলে নিউ থিয়েটার্সের দরজায় টোকা মারলাম। কাজ আমার আগেই হয়ে গিয়েছিল। সহকারী সব শব্দ যন্ত্রের কাজ, শিক্ষানবিশ হিসেবে। দারোয়ানের হাতে স্লিপ দিয়ে অপেক্ষা করছি, খানিক পরে ডাক পরল। স্টুডিও ম্যানেজার জগদীশচন্দ্র ভট্টাচার্য সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বিখ্যাত শব্দযন্ত্রী, মিষ্টভাষী, বিদ্বান ও নিরহংকারী মানুষ বাণী দত্তের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন,”এই নিন আপনার সহকারী।”

যদিও সেটাই আমার প্রথম স্টুডিও দর্শন তবু মনে হয়েছিল আমি অনেক কিছুই জানি। কারণ আর কিছুই নয়, সপ্তাহে চার-পাঁচটি বিদেশি ছবি দেখার সেইসঙ্গে সিনেমা সংক্রান্ত বিদেশি ম্যাগাজিন পড়া। পরে ছবি কি করে তৈরি হয় সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু বই পড়ে জানা আর হাতে কলমে কাজ করার মধ্যে অনেক তফাৎ। সেকালে ছবির জগতে শব্দযন্ত্রীরা ছিলেন সবচেয়ে শিক্ষিত।

অতুল চ্যাটার্জী, মধু শীল, নৃপেন পাল প্রমুখ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের নামকরা ছাত্র। এরা কেউ ফিজিক্সে, কেউ কেমিস্ট্রিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তখনকার দিনে এদের পক্ষে অন্য যেকোনো ভালো কাজ পাওয়া খুব সহজ ছিল কিন্তু এরা ছবির জগতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নতুনত্বের সন্ধানে এক অনাস্বাদিত অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়।

তখন ফরেন এক্সচেঞ্জ পাওয়ার ব্যাপারে ও কোন ঝামেলা ছিল না। নিউ থিয়েটারসের কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকারকে বললেই একটা প্লেব্যাক মেশিন আনিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু বাণীদা মুকুল বোসের তত্ত্বাবধানে স্টুডিওতেই একটি প্লেব্যাক মেশিন তৈরি করে ফেললেন। যতদূর জানি এটিই ভারতবর্ষে তৈরি প্রথম প্লেব্যাক মেশিন। মুকুল বোসের কোনো ইউনিভার্সিটি ডিগ্রী ছিল না কিন্তু শৈশব থেকেই তিনি যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। কৈশোরে সারাদিন কাটাতেন জগদীশচন্দ্র বসুর ল্যাবরেটরীতে।

জগদীশচন্দ্র এটা ওটা এনে দিতেন তাকে। হয়তো এই কারণেই যে কোন যন্ত্র অতি সহজেই মুকুলদার বন্ধু হয়ে যেত। যন্ত্র কে ভালো না বাসলে, যন্ত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব না হলে সে যন্ত্রকে দিয়ে ভালো কাজ করানো যায় না। দশ বছরের পুরনো সাউন্ড মেশিন বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো যেন গতকাল কেনা হয়েছে।। ঝকঝক তকতক করত।

যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে মুকুলদার অগাধ পাণ্ডিত্য শুধু শব্দ যন্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যেকোনো নতুন বিদেশি গাড়ি বা মোটরসাইকেল আগেই খুলে ফেলতেন, তারপর ভিতরটা পর্যবেক্ষণ করে আবার আস্তে আস্তে ফিট করে দিতেন। বাড়িতে তার ঘরে ঢুকবার অধিকার ছিল না কারো। জীবনে ধুলো ঝাড়া হত না। একরাশ যন্ত্রপাতির সঙ্গে ঘর করতেন অকৃতদার মুকুলদা। কোন কিছু নিয়ে কাজ করতে করতে স্ক্রুর প্রয়োজন হলে একটা ম্যাগনেট খাটের তলায় ধরতেন, রাশি রাশি স্ক্রু উড়ে এসে ম্যাগনেটের গায়ে লাগতো, ওর মধ্যে থেকে যেটা দরকার বেছে নিতেন। ট্রান্সমিটার তৈরি করেন ১৯৩৭ সালে। সেই ট্রান্সমিটারে কথা বলতে পারতেন। ১৯৩৯ এর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপ, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্টেশনের সঙ্গে গভর্নমেন্ট বাজেয়াপ্ত করে সেটা।

তখন শব্দগ্রহণের কাজ হত আর. সি. এ. মেশিনে। অতুল চ্যাটার্জি সে যুগে আর. সি. এ. কোম্পানিকে লিখে পাঠান, সাউন্ড ক্যামেরায় একটি এক্সপোজার মিটার লাগালে এক্সপোজার ঠিক হচ্ছে কিনা বোঝা যাবে । অতুলদার কথা মতো আর. সি. এ. কোম্পানি তার পরের মডেল পি. এম. ৩৫-এ এক্সপোজার মিটার লাগালো। এমনই ছিল তাঁদের প্রতিভা এবং কর্মকুশলতা ।

কতদিন দেখেছি শুটিং শেষে আমগাছতলায় সাউন্ড ভ্যান আনিয়ে নিঃশব্দে কাজ করছেন লোকেন বসু একা, মধ্যরাত পর্যন্ত। শুধুই কাজের তাগিদে, ওভারটাইমের জন্য নয়। মাত্র দুটি মাইক্রোফোন দিয়ে গান রেকর্ডিং হত। সেই সব বিখ্যাত গান গেয়েছিলেন সায়গল, কানন দেবী, পঙ্কজ মল্লিক, কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং নবাগত হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । নিউ থিয়েটার্সে পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন নীতিন বসু, দেবকী বসু, হেমচন্দ্র চন্দ এবং ‘উদয়ের পথে’-খ্যাত তখন উদীয়মান বিমল রায়। প্রমথেশ বড়ুয়া তখন নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে দিয়েছেন। ভারতীয় ছবিতে কম্পোজিশন ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে নীতিন বসুর অবদান। কত রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষাই যে করতেন! আর এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার ।

আমার প্রিয় পরিচালক ছিলেন বিমল রায়। তখন তিনি ‘অঞ্জনগড়’ নামে একটি ছবি করছিলেন, তাঁর ইউনিটে সহকারী শব্দযন্ত্রী হিসাবে যুক্ত হই আমি। ভবিষ্যতে পরিচালক হওয়ার জন্যই আমি সিনেমায় ঢুকি, তাই রেকর্ডিং-এর সময়টুকু ছাড়া তাঁর কাজ দেখতাম ।

বিমল রায়কে কোনও দিন ফ্লোরে বসে থাকতে দেখিনি । নিজে ক্যামেরাম্যান ছিলেন, তাই সারাক্ষণ লাইটিং করতেন। তন্ময় হয়ে দেখতাম । বড় সুন্দর, সুষমামন্ডিত লাইটিং। ‘উদয়ের পথে’ ছবিতে চাঁদের আলোর লাইটিং—নিউজলস্ স্প্রে করে কুয়াশা তৈরি—একটি নতুন ধরনের ভিস্যুয়াল আনে ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে গানটিতে ।

তবে এঁদের কাজে সম্পূর্ণ বাঙালিয়ানা থাকলেও হলিউডের ছাপ থেকেই যেত ।

হেমচন্দ্র ছিলেন অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের পরিচালক। চলচ্চিত্রে অভিনয় শিল্পের উপর তাঁর মতো দখল আর কারও ছিল না । অভিনয় শেখাবার জন্য দিনের পর দিন রিহার্সাল দেওয়াতেন । ক্যামেরার সামনে কী করে চলতে হয়—যাকে বলে ফুট-ওয়ার্ক— শেখাবার জন্য একজন অভিনেতাকে হাজারবার সিঁড়ি দিয়ে ওঠাতেন আর নামাতেন। অভিনয় দিয়ে নাটক জমিয়ে তোলা বিশেষত্ব ছিল তাঁর ।

সত্যি বলতে, স্টুডিয়োতে ঢোকবার আগে ভারতীয় ছবির সঙ্গে আমার বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। মাথায় তখন ঘুরছে ফোর্ড, ওয়াইলার, বিলি ওয়াইল্ডার, ক্যারল রীড, কাপ্পা। কিন্তু স্টুডিয়োতে ঢুকে পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, শব্দযন্ত্রী ও অন্যান্যদের একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম এবং চলচ্চিত্রের প্রতি অপরিসীম অনুরাগ দেখে নতুন করে ভালবাসলাম সিনেমাকে ।

দুই দিকপাল সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সে-যুগে, রাইচাঁদ বড়াল আর পঙ্কজকুমার মল্লিক । আমার ধারণা, রাইচাঁদ বড়ালের মতো সঙ্গীত পরিচালক আজও হয়নি। অবাক লাগে ভাবতে তাঁর যথাযথ মূল্যায়নও হয়নি। তাঁকে বোঝবার চেষ্টাও করা হয়নি। গানের সুরে কত যে অভিনবত্ব এনেছেন তিনি, কত নতুনত্ব, নতুন কিছু পাওয়ার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা! গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে সিম্ফনি, অথচ কানন দেবী বা সায়গল যা গাইছেন তা খাঁটি দেশি । দেশ, খাম্বাজ, ভৈরবী ইত্যাদির সঙ্গে কীর্তনের অপূর্ব সংমিশ্রণ ।

রাইদা এবং পঙ্কজদার জন্য একটি বাগানবাড়ি ধরনের বাড়ি ছিল । বাঘা-বাঘা বাজিয়ে মাস মাইনেতে বহাল থাকত। সারা বছর গানের সুর করা হত ওদের নিয়ে । যেদিন শুটিং থাকত না, সেদিন পালিয়ে পৌঁছে যেতাম ওখানে। অকৃত্রিম স্নেহ পেয়েছিলাম রাইদা, পঙ্কজদার কাছে । পরবর্তীকালে আমার ‘লৌহকপাট’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালক হয়েছিলেন পঙ্কজদা ।

একদিন, মনে আছে, পঙ্কজদা গাইছেন, ‘সর্ব খর্ব তারে দহে তব ক্রোধ দাহ’ । দরাজ কণ্ঠ । আমি পিছনে বসে চুপিসাড়ে ওঁর পিঠে কান রেখে ৩৫ শুনতে লাগলাম । সমস্ত শরীর প্রকাশিত হয়ে উঠল। পঙ্কজদা হেসে বললেন, ‘এ ছেলেকে নিয়ে আর পারা যায় না।’ এই গানটি দেওয়া হয়েছিল ‘অঞ্জনগড়’ ছবিতে, গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখার্জি ।

পঙ্কজদা অনেক সময় কাজ করতেন ক্যাসানোভার অর্কেস্ট্রা নিয়ে । যতদূর মনে আছে কাননদেবীর গাওয়া ‘প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়’ গানটিতে সংগত করেছিল ক্যাসানোভার অর্কেস্ট্রা। আমার ভুলও হতে পারে । কাননদেবীর গাওয়া ‘পায়ে চলার পথের কথা’ গানটি রাইদার একটি অনবদ্য সৃষ্টি। কত যে ছন্দ, তাল-ফেরতা, সুর ও কথা নিয়ে কত যে খেলা, তা আজকের দিনে কল্পনা করা যায় না ।

নিউ থিয়েটার্স একই সঙ্গে হিন্দি ও বাংলা ছবি করত । রাইদা উর্দু গানে কীর্তন লাগিয়ে সারা ভারতবর্ষ মাতিয়ে দিলেন। হিটের পরে হিট গান । কিন্তু সে গান খালি গলায় গাইলে জমত না, একইভাবে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে মেশানো থাকত । আসল কথা, সব কিছুর পিছনে প্রচণ্ড পরিশ্রম, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সঙ্গীত শিল্পের উপর অসামান্য দখল ছিল রাইদার। দুঃখ এই আজ আর কেউই রাইচাঁদ বড়ালকে নিয়ে আলোচনা করে না ।

মাত্র দু বছর ছিলাম নিউ থিয়েটার্সে। ‘ক্যালকাটা মুভিটোন’ নামে একটি নতুন স্টুডিয়ো তৈরি হচ্ছিল, বাণীদা তার প্রধান যন্ত্রশিল্পী হিসাবে কাজ নিলেন । আমাকে ডাকলেন স্বাধীন শব্দযন্ত্রী হিসাবে কাজ করার জন্য । চলে গেলাম ।

নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োটি ছিল খুব সুন্দর। দশ বিঘা জমি । মিস্টার সরকার দেশবিদেশ থেকে নানা রকমের গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। ক্রমে গাছগুলি বিশাল হয়ে উঠেছিল। কত রকমের পাখি আসত সে সময় । একটা গাছে দু রঙের ফুল হত। বৃষ্টির সময় বড় সুন্দর লাগত দেখতে । একটা টেনিস কোর্টও ছিল, মাঝে মাঝে ক্রিকেট পিটতাম সেখানে ।

সবচেয়ে বড় অবদান, নিউ থিয়েটার্স অনেক ভাল টেকনিসিয়ান তৈরি করেছিল । এঁদের অধিকাংশই বম্বে চলে যান। এক কথায়, চলচ্চিত্রের প্রাথমিক শিক্ষার একটি উপযুক্ত স্থান ছিল নিউ থিয়েটার্স ।

ক্যালকাটা মুভিটোনে যোগ দেওয়ার সময় বহু মানুষের সঙ্গে মিলে সাত বিঘা জমির উপর একটা ফিল্ম স্টুডিয়ো নিজের হাতে তৈরি করার অভিজ্ঞতা বিরাট। যদিও আর. সি. এ.-র ইঞ্জিনিয়াররা এসে অসংখ্য প্যানেল একটু একটু করে জুড়ে মেশিন ফিট করলেন, তবু তাদের সঙ্গে থেকে, কাজ দেখে, লিটারেচার পড়ে অনেক জানলাম, অনেক শিখলাম । এই সময়ে নতুন করে পেলাম ফিজিক্সে বাণীদার গভীর জ্ঞানের পরিচয়। আনকোরা নতুন মেশিনে কাজ করতে খুব ভাল লাগত । একটা নতুন মিচেল ক্যামেরাও এল । ফ্লোরের মধ্যে অ্যকোয়াস্টিসের কাজও দেখলাম ।

স্টুডিয়ো চালু হল এক বছর পরে । তখন বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে সবে। বিশ্বকর্মা পুজোর দিনের ঘুড়ির মতো রাশি রাশি কালো টাকা উড়ছে কলকাতার আকাশে । সুতরাং ওয়ার-টাইম প্রোডিউসারের অভাব নেই । চার-পাঁচদিন করে শুটিং হয় আর বন্ধ হয়ে যায়। আমিও সাউন্ডে হাত পাকাই । নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট করি । জানতাম কোনও দিনও শেষ হবে না ছবিগুলি। অবসর সময়ে চৌরঙ্গি পাড়ায় আমেরিকান আর ব্রিটিশ ছবি দেখতাম । বাণীদা আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন ।

সে-যুগে অপটিক্যাল সাউন্ড রেকর্ডিং-এর বাঁধাধরা নিয়ম ছিল। যেমন বাজ পড়ার আওয়াজ বা গুরুগুরু মেঘের ডাক তোলার জন্য সোজাসুজি কালবৈশাখীর নীচে মাইক্রোফোন ধরা যেত না। শব্দের প্রচণ্ডতায় ছিঁড়ে যেত গ্যালভানোমিটার। ভাবতাম, কী করে বাজপড়া বা মেঘের ডাক তোলা যায় ।

একদিন হঠাৎ চোখে পড়ল, একটা পুরনো ভাঙা বিশাল জলের ট্যাঙ্ক পড়ে আছে মাঠে । বাণীদাকে বললাম, একটু মেঘের ডাক, বাজ পড়ার আওয়াজ রেকর্ড করার চেষ্টা করব ? তিনি সানন্দে রাজি হলেন, জিজ্ঞেসও করলেন না কী করতে চাইছি। একটা চেয়ার টেনে বসে তামাশা দেখতে লাগলেন ।

আমি ট্যাঙ্কের মধ্যে মাইক্রোফোন সুদ্ধু বসিয়ে দিলাম বুম্‌ম্যানকে । আমার সহকারীকে বললাম, ট্যাঙ্কের উপর তবলার রেলার মতো বাজাতে একটু জোরে। শুনে দেখলাম মন্দ হচ্ছে না। তারপর একটা খবরের কাগজ ট্যাঙ্কের মুখের কাছে কড় কড় কড়াৎ করে ছিঁড়তে বললাম। রেকর্ড করে ল্যাবরেটরিতে পাঠালাম ডেভেলপ করার জন্য। স্কোরিং থিয়েটারে সাউন্ড শুনে অবশ্য বুঝলাম কিছুই হয়নি । বাণীদা হাসতে হাসতে বললেন, জানতাম হবে না । অন্য উপায় ভাবো । এইভাবে আমাদের কাজ চলত ।

শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ ছবির শুটিং হচ্ছে। অহীন্দ্র চৌধুরী, সুনন্দা দেবী, জহর গাঙ্গুলি প্রমুখ সে-যুগের বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীর সমাবেশ । বিদ্যাপতি ঘোষ ক্যামেরাম্যান । তিনি তখন জার্মানির ইউফা স্টুডিয়ো থেকে দেশে ফিরেছেন, সঙ্গে জার্মান স্ত্রী । তিরিশের দশকের শেষে ‘নীচানগর ’ ছবির কাজের জন্য কান্ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিলেন বিদ্যাপতি ঘোষ। এইসব হংসের মধ্যে বক যথা, তরুণ, অনভিজ্ঞ শব্দযন্ত্রী আমি ।

খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল অহিনদার সঙ্গে। সাউন্ডট্র্যাকের সামনে একটা চেয়ারে বসতেন আর সেকালের স্টেজের গল্প করতেন। বিদেশের স্টেজের ইতিহাসও তাঁর জানা ছিল। মাঝে মাঝে খুব আস্তে আস্তে কী সুন্দর করে মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে আবৃত্তি করতেন । তখন তাঁকে স্টেজের অহীন্দ্র চৌধুরী মনে হত না ।

অহিনদার বাড়িতে বিরাট লাইব্রেরি। অধিকাংশ সময় কাটাতেন পড়াশুনো করে । একদিন শুটিং-এর সময় বিদ্যাপতি ঘোষ লাইটিং করছেন । রাসবিহারীরূপী অহীন্দ্র চৌধুরী বিছানায় শুয়ে। পাশে গল্প করছেন জহর গাঙ্গুলি ও সুনন্দা দেবী । মাইক্রোফোনে সব শুনতে পাচ্ছি । হঠাৎ কানে এল অহিনদার নাক ডাকার আওয়াজ—যত সময় যাচ্ছে ততই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ পরে বিদ্যাপতি ঘোষ বললেন, ‘রেডি’ । পরিচালক আমাকে বললেন, ‘রিহার্সাল’। অহিনদা তখনও নাক ডাকছেন । কিন্তু সুনন্দা দেবী সংলাপ বলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে নাকডাকা থেমে গেল এবং পর মুহূর্তেই সংলাপ বলতে লাগলেন অহিনদা ।

শটের পর তিনি বাইরে বেরিয়ে আসতে বললাম, ‘আজ দেখালেন ! ঘুমন্ত অবস্থায় নির্ভুল সংলাপ বললেন কী করে ?’ অহিনদার সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘স্টেজে হাজারবার রাসবিহারী করেছি। প্রত্যেকের সংলাপ আমার কণ্ঠস্থ । এ কি সিনেমা হচ্ছে ? এ তো স্টেজ ! আর ভাল লাগে না । ” আমার জানাশোনা বিশ্বের বিখ্যাত অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র অহীন্দ্র চৌধুরীই ঘোষণা করেছিলেন অমুক দিন থেকে আমি অভিনয় জীবন থেকে অবসর নেব। নিয়েওছিলেন তাই ।

তেমন ভাল চলছিল না স্টুডিয়ো। তার কারণ আমাদের প্লে-ব্যাক মেশিন ছিল না । গান ছাড়া বাংলা ছবি হয় না। সুতরাং স্টুডিয়ো নতুন হলেও, যেখানে প্লে-ব্যাক মেশিন নেই সেখানে পার্টি আসে না ।

কিছুদিন থেকেই লক্ষ করছিলাম বাণীদা গভীরভাবে ড্রয়িং করে চলেছেন । হঠাৎ একদিন আমাকে বললেন, ‘দেখ তো, একটা তিন বাই চার গিয়ারের ড্রয়িং হয়েছে কি না !’ দেখলাম, নিখুঁত ড্রয়িং। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন গিয়ারকে তিন বাই চার-এর রেশিওতে লাগাবো ?’ বললেন, ‘মুভিওয়ালাটাকে প্লে-ব্যাক মেশিন করতে হবে । কর্তৃপক্ষ যখন আর টাকা ঢেলে প্লে-ব্যাক মেশিন কিনবেন না বলে স্থির করেছেন, তখন আমাদেরই কিছু একটা করতে হবে। মুভিওয়ালার আর পি এম ১৫০০ আর ক্যামেরার আর পি এম ১৪৪০, সুতরাং তিনের চার রেশিওতে একটা গিয়ার কাটিয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

হাওড়া থেকে এল লেদ মেশিনের লোক। সব মাপজোক নিয়ে দিন পনেরোর মধ্যেই নতুন গিয়ার তৈরি করে দিয়ে গেল সে । লাগানো হল । আমার উপর দায়িত্ব পড়ল রোজ মুভিওয়ালাতে হাজার ফিটের একটা ডামি ফিল্ম রোল চাপিয়ে স্টপ ওয়াচ্ হাতে নিয়ে চালানো আর দেখা প্রতি মিনিটে ৯০ ফুট চলছে কি না। দেখি একেবারে অঙ্কের মতো ঠিক ।

তখনকার দিনের বিখ্যাত পরিচালক অজয় কর স্টুডিয়ো দেখতে এলেন । তিনি নিজে ক্যামেরাম্যান। সুতরাং নতুন মিচেল ক্যামেরা দেখে খুব খুশি। বললেন, ‘সব কিছুই তো সুন্দর। তবে শুনলাম আপনাদের নাকি প্লে-ব্যাক মেশিন নেই ?’ আমি বললাম, ‘কে বললে ? আমরা শেফিল্ড থেকে নতুন প্লে-ব্যাক মেশিন আনিয়েছি।’ বলে মুভিওয়ালা আর গিয়ার দেখিয়ে বললাম, ‘হাওড়া—হাওড়া, শেফিল্ড অব ইন্ডিয়া । ’

একদিন স্টুডিয়োতে আসার সময় দেখি রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে একটা লোক আমগাছের চারা বিক্রি করছে। আট আনায় একটা চারা কিনলাম । স্টুডিয়োর চিফ ইলেকট্রিসিয়ান হরেনবাবুর সঙ্গে পুকুরপাড়ে পুঁতলাম চারাটা । তখন ভরা বর্ষা, রোজ জল দেওয়ার প্রয়োজন হত না ।

প্রায় বছর কুড়ি পরে আমার কোনও একটা ছবির সেট পড়েছিল ক্যালকাটা মুভিটোনে । স্টুডিয়োতে ঢুকতেই সবাই ছুটে এল । হরেনবাবু আমার হাত ধরে বললেন, ‘কত বছর পরে এলেন । আগে একটা জিনিস দেখাই ।’ দেখলাম একটা বিরাট আমগাছ। তার ডালে ডালে মুকুলের মেলা । হরেনবাবু বললেন, ‘মনে আছে ?’ বললাম, ‘ছিল না, মনে পড়ল । ‘ এইভাবে কত কাণ্ড যে করেছি, আজ আর সব মনে পড়ে না ।
(পরিচালক তপন সিনহা রচিত ‘মনে পড়ে’ থেকে সংগৃহীত)

One thought on “‘Mone Pore’ an memoir by Tapan Sinha – তপন সিনহার স্মৃতিকথা ‘মনে পড়ে’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *