ফিল্মি পার্সোনালিটি

‘Mone Pore’ an memoir by Tapan Sinha – তপন সিনহার স্মৃতিকথা ‘মনে পড়ে’

Tapan Sinha

Memoir of Tapan Sinha

সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তখন থাকতেন হ্যারিসন রোডের কাছাকাছি পটলডাঙা স্ট্রিটে। একদিন গেলাম তাঁর কাছে। তাঁর ছোটগল্প ‘সৈনিক’ অবলম্বনে আমার প্রথম ছবি করবার কথা ভেবেছিলাম । নারায়ণবাবু একজন অমায়িক, উদার এবং সত্যিকারের বিদগ্ধ মানুষ ছিলেন । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পড়াতে পড়াতে মার্জিত ভাষায় কথা বলা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । ‘সৈনিক’ সম্পর্কে আমার ইচ্ছার কথা শুনে প্রথমটায় অবাক হয়ে গেলেন । তারপর খুশি হয়ে বললেন, ‘এই তো চাই ! আপনাদের মতো তরুণরাই এইসব গল্প ভাববেন।’ আমার বেশ মনে আছে দক্ষিণার কথা তুলতে তিনি বলেছিলেন, “কিছু চাই না। আপনার সাহসই আমার দক্ষিণা।’ অভিভূত হয়েও বললাম, ‘তা হয় না। সামান্য কিছু আপনাকে নিতেই হবে।’ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে যেতে খুব ভাল লাগত । বিশেক করে ‘ভারতী’ যুগের সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল । অনেক অজানা কথা জেনেছিলাম। যখনকার কথা বলছি, সেইসময় রামমোহন রায়কে নিয়ে একটি নাটক লেখার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি । রামমোহনের জীবন ও দর্শন সম্বন্ধে তাঁর ধারণা ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং মৌলিক । শুধু রামমোহন সম্পর্কেই নয়, বিদ্যাসাগর সম্পর্কেও নারায়ণবাবুর সঙ্গে আলোচনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করে। এঁদের সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই কৌতূহল ছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কৌতূহল সুস্পষ্ট ধারণায় পরিণত হয়। এই ধারণা থেকেই মানুষের একক সংগ্রামের সার্থকতায় আমার বিশ্বাস জন্মায়। পরবর্তীকালে আমার অনেক ছবিতে এই বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে। সত্যি বলতে, গোষ্ঠীবদ্ধ লড়াইয়ের প্রতি আমার কোনও দিনও আস্থা ছিল না; আজও নেই। এই লড়াই হয়তো সহজে জেতা যায়, কিন্তু পরে মানুষে মানুষে মতান্তর হয়, মতান্তর পরিণত হয় কলহে । ফলে লড়াইয়ের অন্তর্নিহিত আদর্শবোধও হারিয়ে যায়। দেশে কিংবা বিদেশে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয়। অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন না, পাল্টা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দেখাবেন ; তাতেব্যক্তির গরিমা, সাহস, সততা সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টাবে না ।

যাই হোক, ছবি শুরু করলাম ‘অঙ্কুশ’ নাম দিয়ে। বাংলা ও হিন্দিতে, একসঙ্গে ডাবল ভারসান ।

ঠিক এই সময় একদিন বংশীচন্দ্র গুপ্ত এসে বলল, ‘মানিক তোমাকে একবার ডেকেছে।’ বললাম ‘মানিক, মানে অসিত সেন ? বংশীর উত্তর, ‘না। সত্যজিৎ রায়

কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে সত্যজিৎ রায়ের নাম শুনেছিলাম । ভাবলাম, ইনি আবার আমাকে ডাকছেন কেন ? পরিচয় হওয়া দূরের কথা, ভদ্রলোককে কোনওদিন চোখেও দেখিনি । গিয়ে দেখি, ও হরি, এ তো সেই ভদ্রলোক – মেট্রো, লাইট হাউসের সিনেমা টিকিটের লাইনে যাঁকে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি ! উচ্চতা যে-কারও চেয়ে এক হাত লম্বা, খোদাই করা মুখ, মায়াময় আয়ত দুটি চোখ ।

পরিচয়ের পর সত্যজিৎবাবু কোনও ভূমিকা না করেই বললেন, ‘পথের পাঁচালী ছবি করব । সবটাই আউটডোরে—সাউন্ডের ব্যাপারটা কী করা যায় বলুন তো ?’ তারপর, ‘আচ্ছা এক কাজ করা যাক, আপনার সময় আছে ?” বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘স্ক্রিপটা শুনবেন ? তাহলে হয়তো আপনার বোঝার সুবিধে হবে।’ সানন্দে রাজি হলাম। সত্যজিৎ রায়ের মুখে ‘পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্য শুনতে শুনতে কখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম, খেয়াল করিনি । এর আগে দেশ-বিদেশের বহু স্ক্রিপ্‌ আমি পড়েছি, কিন্তু এ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা। ঘণ্টা দুয়েক ধরে স্ক্রিপ্‌ শোনানোর পর বললেন, ‘বলুন, সাউণ্ড নিয়ে কী করা যায় ?’ বললাম, ‘দূর ! স্ক্রিপ্‌ শুনে সাউণ্ড-টাউণ্ড কোথায় উড়ে গেছে, ভাবছি কী করে এমন কাজ করলেন ! হাসতে হাসতে তিনি বললেন, ‘আপনার ভাল লেগেছে ?” সংক্ষেপে বললাম, ‘অসাধারণ !’ সত্যজিৎ বললেন, ‘আমার ইউনিটের বাইরে আপনাকেই প্রথম শোনালাম। আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, এককাপ কফি খেয়ে চলে এসেছিলাম সেদিন। সাউন্ড নিয়ে আলোচনা আর করা হল না ।

এমনই অদৃষ্ট, আমার ‘অঙ্কুশ আর সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ একই ডিস্ট্রিবিউটারের হাতে পড়ল ; নাম রাণা দত্ত ডিস্ট্রিবিউটার। ‘অঙ্কুশ”-ও আউটডোরপ্রধান ছবি। ফিল্ম সার্ভিসেস ল্যাবরেটরিতে একটা ‘ভিন্টেন’ ক্যামেরা ছিল, খুব সুন্দর ক্যামেরা । তাই নিয়ে শুরু করলাম কাজ । বাংলা ভারসান কোনওরকমে শেষ হলেও হিন্দিটা আর হল না। যথা সময়ে উত্তরা, পূরবী, উজ্জলা-তে মুক্তিও পেল ছবি। চলেছিল মাত্র নয় দিন । পরিচালক হিসাবে ফ্লপ ছবির ইতিহাসে আমিই বোধহয় প্রথম হয়েছিলাম । রানা দত্ত কোম্পানির দেনা শোধ করতে ছয়-সাত বছর লেগেছিল ।
সত্যজিৎবাবু অবশ্য আগেই ওই কোম্পানি ছেড়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায় ‘পথের পাঁচালী’র কাজ শেষ করেন। তারপরের ইতিহাস কে না জানে !

যতদূর মনে পড়ে, কয়লাখনির আশপাশের ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রথম প্রবেশ করেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। পরে নিউ থিয়েটার্সে চিত্রনাট্য লিখতেন । আর একজন দিকপাল সমালোচক ও সাহিত্যিক নিউ থিয়েটার্সের চিত্রনাট্য এবং গানও রচনা করতেন, নাম সজনীকান্ত দাস। শৈলজানন্দ, অনেক ‘হিট’ ছবি পরিচালনা করেন । ‘অঙ্কুশ’ মার খাবার পর শৈলজানন্দের ‘কৃষ্ণা’ নামের গল্প নিয়ে ছবি করার পরিকল্পনা করলাম । তখন আমার ঝুলি শূন্য বলা ভাল, টাকার বদলে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, অসম্মান, অপমানের আবর্জনায় ঝুলি ভরে উঠেছে। ঠিক এই সময়ে কোয়েম্বাটোরের নব-নির্মিত ‘নারাসু’ স্টুডিও থেকে মোটা মাইনের শব্দযন্ত্রীর কাজ পেলাম । টাকার দরকার ছিল, কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না কী করব । দু-তিন দিন মনের সঙ্গে লড়াই চলল। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম হাজার লাঞ্ছনা সহ্য করেও ছবি আমাকে করতেই হবে। এবং ‘কৃষ্ণা’ অবলম্বনেই করব । গল্পের রাইট কিনতে শৈলজানন্দের শরণাপন্ন হলাম। শৈলজাবাবু তখন সিনেমালাইন গুলে খেয়েছেন । বললেন, ‘গল্প যার তাকে কিছু দেবে তো ?’ বললাম, ‘নিশ্চয়ই, তবে এককালীন দেওয়া সম্ভব নয় । এখন কিছুটা দেব, বাকিটা ছবির ডিস্ট্রিবিউশন হলে দেব ।’ তিনি রাজি হয়েছিলেন ।

56

ছবি শুরু হল ‘উপহার’ নাম দিয়ে। উত্তমকুমার তখন সবে নাম করেছেন । কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তমকুমার, নির্মলকুমার, মঞ্জু দে ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ছবি শেষ হল, যথাসময়ে রিলিজও করল। মোটামুটি একটা ব্যাপার হয়েছিল আর কি। তবে পরের ছবির কথাও ভাবতে শুরু করলাম ।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের একটি নাটক পড়েছিলাম, নাম ‘টনসিল’ । ‘বরযাত্রী’র সেই বিখ্যাত গন্শা, ত্রিলোচন, ঘোনাদের নিয়ে নির্ভেজাল আনন্দের নাটক । তখন আমার একমাত্র লক্ষ্য যে করেই হোক ছবি বাজারে লাগাতে হবে । ভাবলাম ‘টনসিল’-ই করি ।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় থাকতেন দ্বারভাঙ্গায়। ‘জয় মা’ বলে একটা পোস্টকার্ড ছাড়লাম। জবাবে তিনি দ্বারভাঙ্গায় যেতে বললেন। চিত্রনাট্য তৈরি করে রওনা হলাম আমি ।

কত বড় সাহিত্যিকের কাছে যাচ্ছি। ততদিনে বিভূতিবাবুর সব লেখাই পড়ে ফেলেছি। বিশেষ করে ‘রানুর প্রথম ভাগ’ আর ‘নীলাঙ্গুরীয়’ গাঁথা হয়ে গিয়েছিল মনে। কিন্তু এই যে যাচ্ছি, সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার তো নয়, ৫৪ ওঁর গল্পের রাইট কিনতে যাচ্ছি। কাজেই বেশ ভয় করতে লাগল — যদি পত্রপাঠ বিদায় করে দেন ! কিন্তু, আমার ধারণা ভুল হয়েছিল। দ্বারভাঙ্গা স্টেশনে নামতেই দেখি স্বয়ং বিভূতিভূষণ দাঁড়িয়ে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন। বড় লজ্জা লাগল ।

বিভূতিবাবু বললেন, ‘ট্রেনে দ্বারভাঙ্গা আসা বড় ক্লান্তিকর । কোনও অসুবিধে হয়নি তো ?’ মুখে বললাম, ‘না, কোনও অসুবিধে হয়নি, যদিও বিস্তর অসুবিধে হয়েছিল। ‘অঙ্কুশ’-এর মারের ঘা তখনও শুকোয়নি । সুতরাং ট্রেনে ভিড়ে-ঠাসা থার্ড ক্লাসে ভ্রমণ করা ছাড়া উপায় ছিল না ।

বাইরের বাড়িতে একা থাকতেন বিভূতিভূষণ। ডাকবাংলো ধরনের একটি ছোট্ট বাংলো । তার তিন পাশে পুকুর কাটা, সেখানে আবার লাল শালুক উঁকি মারছে । রুক্ষ বিহারে বাংলার পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াস। তাঁর আতিথেয়তায় প্রথমেই শুরু হল খাওয়ানোর ধুম। আমি কোনওদিনই খাইয়ে নই। সুতরাং জলখাবারের আয়োজন দেখে মাথা ঘুরে গেল । ‘অসহায় ভাবে তাঁর দিকে তাকাতে বললেন, ‘খান, খান । সব বাড়ির তৈরি। আপনার চেহারা দেখে তো পেটরোগা বাঙালি বলে মনে হয় না। ” এড়ানোর চেষ্টায় স্ক্রিপ্‌ কখন শুনবেন বলাতে বললেন, ‘হবে হবে । এত ব্যস্ত কেন ?’

দুপুরে আবার বিরাট খাবার আয়োজন, এবার ভেতর-বাড়িতে। আসন পেতে তিনিও আমার সঙ্গে খেতে বসলেন । এলাহি আয়োজন । আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘অসম্ভব! অর্ধেক খাবার তুলে নিতে অনুরোধ করলাম । তবুও যা খেতে হল তাতেই আইঢাই অবস্থা ।

বেলা দুটো নাগাদ বসা হল স্ক্রিপ্‌ নিয়ে । খানিকক্ষণ পড়ার পর অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম আমি । এই স্ক্রিপ্‌ই যখন স্টুডিয়োতে ভানু, জহর, অনুপদের শুনিয়েছিলাম, ওরা হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। হাউসে রিলিজ হওয়ার পর দর্শকরাও হেসেছিলেন দমফাটা হাসি। চলচ্চিত্র সমালোচক পঙ্কজ দত্ত ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়, এমনই নির্ভেজাল হাসির ছবি। কিন্তু, বিভূতিভূষণের মুখে হাসি নেই । গম্ভীর মুখে স্ক্রিপ্‌ শুনে চলেছেন । ভাবলাম, গেলাম ! নিশ্চয়ই গল্পের রাইট দেবেন না ! তখন হঠাৎ একটি শিশু এসে তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘দাদু, একটা বেলুন দাও ।’ বিভূতিবাবু উঠতে উঠতে বললেন, ‘আর পারি না । সকাল থেকে চারটে বেলুন ফাটালে !’ শিশুটিকে বেলুন দিয়ে আমাকে বললেন, ‘এর মাকে আপনি চেনেন।’ আমি একটু অবাকই হলাম । জিজ্ঞেস করলাম, ‘উনি কি ভাগলপুরে থাকেন ?’ বিভূতিভূষণ হেসে বললেন, ‘না। ওর মায়ের নাম রানু।’ বললাম, ‘আমি কেন ? রানু প্রত্যেকটি বাঙালির অতি আদরের । কিন্তু তাঁর মেজকা হাসির স্ক্রিপ্‌ শুনে একবারও হাসছেন না, ব্যাপারটা কি ?’ এবার মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বিভূতিবাবু বললেন, ‘বেশ ভাল লাগছে । পড়ুন ।

টাকা পয়সা বিষয়ে কোনও চাহিদা ছিল না তাঁর। যা দিলাম তা অতি সামান্য। কিন্তু তাঁর একদিনের সান্নিধ্যে আমি যা পেলাম তা অনেক । সঙ্গে করে দ্বারভাঙ্গা শহর দেখালেন । রাজার বাড়ি, রাজার ছোট ভাইয়ের বাড়ি । আর কত যে যত্ন ! তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহ, আতিথেয়তা কোনওদিন ভুলতে পারব না ।

‘টনসিল’ ছবি করার সময় এক ধূমকেতুর সঙ্গে পরিচয় হয়। এই ধূমকেতুটির নাম গৌরকিশোর ঘোষ। আজ প্রায় চল্লিশ বছরের বন্ধুত্ব আমাদের, গৌর সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে মনে হবে অতিরঞ্জিত করছি। তবুও বলি, গৌরকিশোর ঘোষ এক বিরল মানুষ, বিরল শিল্পী, বিরল বন্ধু ।

মানুষের ভালবাসা, স্নেহ, বন্ধুতা পেতে পেতে এগিয়ে চলেছি। ছবি করছি। সিনেমাজগতে কিছুটা পরিচিতিও পেয়েছি ততদিনে। আমার ‘কাবুলিওয়ালা’ নিয়ে তখন হইচই পড়ে গেছে সারা ভারতে । যে সব জায়গায় (যেমন বম্বে, পুনা, দিল্লি, মাদ্রাজ) বাংলা ছবি কোনওদিন স্থানীয় ছবির মতো মুক্তি পায়নি, ‘কাবুলিওয়ালা’ সেখানেও তুলকালাম লাগিয়ে দিয়েছিল ।

তা হলে হবে কি, সেই সময়েই একদিন হঠাৎ সত্যজিৎবাবুর টেলিফোন, ‘নিজে একজন টেকনিশিয়ান হয়ে এত খারাপ টেকনিক্যাল কাজ করলেন কি করে ?’ ছবি করার সময়ে আমার অসহায়তার কথা কিছু বললাম না তাঁকে । অপরাধ স্বীকার করে নিলাম। তিনি বললেন, ‘এত ভালমানুষ সাজবার দরকার নেই। কাজের সময় কোনও কমপ্রোমাইজ করবেন না।’ কাকে বলা ! চিরকালই আমাকে কমপ্রোমাইজ করে চলতে হয়েছে ।

খবর পেলাম ‘অতিথি’ ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যাচ্ছে। আবার সত্যজিৎবাবুর টেলিফোন, ‘শুনুন, রাশি রাশি নৌকোর মধ্যে তারাপদ ঝাঁপিয়ে পড়ল—এখানেই ভেনিসের জন্য ছবি শেষ করুন। পরে ওসব মা-ফা বাদ দিন । আর ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকে রবীন্দ্রনাথের গান বাজাবার কি দরকার ছিল ! ওটা কলকাতার জন্যে ঠিক আছে, বিদেশে কেউ বুঝবে না । মিউজিক নিজে কম্পোজ করলেন না কেন ? সত্যজিতের কথা মতো ভেনিসের জন্য ওই জায়গাতেই ছবি শেষ করি। তাতে ফল ভালই হয়েছিল ।

সত্যজিৎ রায় বড় মজার মানুষ ছিলেন। প্রথম দিকে প্রায় বিশ বছর স্টুডিয়োতে আসতেন। সব সময়েই কাজ নিয়ে। হয়তো আমি গান রেকর্ডিং করছি, উনি হাঁটতে হাঁটতে বলে গেলেন, ‘কি—সুর ভাঁজছেন ? এইরকম আর কি, ব্যস্ত, কিন্তু সহৃদয় ।

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে বি.এম.পি.এ. একটি বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাঙ্গালোর থেকে দেবীকা রানি আসেন প্রধান অতিথি হিসাবে। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন সভাপতি। ডাঃ রায় বক্তৃতার সময় উল্টোপাল্টা নাম বলতেন। সেদিন বলেছিলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারকে কতবার বলেছি যে বাংলা ছবির জন্যে কিছু টাকা দাও, আমাদের তরুণ পরিচালকেরা ভাল ভাল কাজ করছে। তা ওরা শোনেনি। এখন সত্যজিৎ যখন ‘কাবুলিওয়ালা’ করল আর তপন ‘পথের পাঁচালী’ করে নানা পুরস্কার পেল তখন আশা করি ওদের টনক নড়বে।’ ওই বক্তৃতার সময় সত্যজিৎবাবু আমার পাশেই বসেছিলেন। ডাঃ রায়ের কথা শুনে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বললেন, ‘পথের পাঁচালী করার জন্য আমার অভিনন্দন জানাই । ’

ধীরে ধীরে সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে আমার একটা নিবিড় সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল। তাঁর বাড়িতে বেশি যাওয়া সম্ভব হত না, টেলিফোনের মাধ্যমেই যোগাযোগ হত । নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘অবতরণিকা’ গল্প অবলম্বনে তাঁর ‘মহানগর’ ছবি দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল এ যেন পৃথিবীর সমস্ত মধ্যবিত্তের কাহিনী, শুধু পোশাক আর ভাষা আলাদা । তারপর এল ‘চারুলতা’ । টেলিফোনে বললাম, ‘চারুলতা একেবারে ওভার বাউণ্ডারি । কিন্তু দুঃখ হচ্ছে, মহানগর -এ যে ছ’টি বলে ছ’টি বাউণ্ডারি করেছেন তা কেউ মনে রাখবে না।’ আমার কথা শুনে টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে খুব হাসতে লাগলেন তিনি। অনেক বছর পরে একবার দিল্লি থেকে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কলকাতা ফিরছি দুজনে । প্লেন একঘণ্টা লেট ছিল। দুজনে বসে চুপচাপ বই পড়ছি, হঠাৎ বললেন সত্যজিত্বাবু, ‘জানেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন। সবাই ‘চারুলতা’র কথা বলে, ‘মহানগর’ বোধ হয় হারিয়েই গেল।” বললাম ‘না, হারায়নি । আপনার কোনও কাজ হারাবে না। ‘

একদিন স্টুডিয়োতে সত্যজিৎবাবু আমার ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন, আমি তাড়াতাড়ি দরজার কাছে গিয়ে হাঁক দিলাম, ‘এই যে, সব্যসাচী বাবু ! এক পেগ কফি চলবে ?’ উনি আমার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘মানে ?’ বললাম, ‘আপনার ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় সমান দখল। ‘ বললেন, ‘স্টেটসম্যানের লেখাটা পড়েছেন বুঝি ?’ বললাম, ‘দারুণ লেখা । একটু অন্যমনস্ক হয়ে তিনি বললেন, ‘ছবি নিয়ে একটা বড় লেখার ইচ্ছে আছে। সময় পাচ্ছি না । দেখি । ‘

একবার দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে কলকাতা থেকে সত্যজিৎবাবু, আমি আর অরুন্ধতী দেবী গিয়েছিলাম। শারীরিক কারণে বিজয়াদি (বিজয়া রায়) যেতে পারেননি। তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন ইন্দ্রকুমার গুজরাল। ফেস্টিভ্যালও এখনকার মতো এমন বিরাট আকারে হত না । মন্ত্রীর পার্টিতে সত্যজিৎবাবু, অরুন্ধতী দেবী, রাজকাপুর, নার্গিস, শিবাজী গণেশন প্রভৃতি অনেকেই বসে আছেন । আমি কিছু বিদেশি মহিলার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হঠাৎ সত্যজিৎবাবু আমাকে শুনিয়ে বাংলায় বলে উঠলেন, ‘অরুন্ধতী, তুমি কিছু বলো ! তপন একডজন মেয়ে নিয়ে করছে কি ?’ আমিও বাংলায় উত্তর দিলাম, ‘আপনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক। সেখানে তো পৌঁছতে পারব না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বন্ধু হতে ক্ষতি কি ?’ ওঁর উত্তর, ‘ন্যাকামো!’ রাজ, নার্গিস, অরুন্ধতী সবাই হেসে উঠল ।

সত্যজিৎবাবুর বিরাট দেহ ও গম্ভীর গলার আওয়াজের আড়ালে একটি শিশু বাস করত। তাঁর রাগ, অভিমান, হাসির আড়ালে সবসময় সেই শিশুটিকে দেখতে পেতাম ।

‘অতিথি’ ছবি শেষ করে দার্জিলিঙে প্রযোজক এস.এন. সরকার আর মীরা সরকারের আতিথ্য নিয়েছি। সরকারদের বাড়ি ‘পিকো টিপ’ অত্যন্ত সুন্দর । পাশেই উইণ্ডার মেয়ার হোটেলে উঠেছেন সত্যজিৎবাবু, কিন্তু দেখা হচ্ছে না। বিজয়াদি বললেন, ‘মাত্র একবার হোটেল থেকে বের হয় । সিগারেট কিনতে । ঘরে বসে ‘নায়ক’-এর স্ক্রিপ্‌ করছে। ‘

আমরা একদিন খেতে ডাকলাম। এলেন। খানিকক্ষণ তাস পেটা হল । যাবার সময় বললেন, আজ ‘নায়ক’-এর স্ক্রি শেষ করব। কাল সকালে একবার শুনবেন ? অরুন্ধতী, তুমিও এসো না ?’

দুজনেই গেলাম। ঝাড়া চারঘণ্টা চিত্রনাট্য শুনলাম। চমকিত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা । বললেন, ‘এ ছবিতে উত্তমকে নেব ভাবছি, ঠিক হবে না ?’ বললাম, ‘উত্তম ছাড়া এ চরিত্র হয় না । ত

দার্জিলিঙে থাকাকালীন একদিন ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা আত্মপ্রকাশ করেছিল । দুপুরে বিজয়াদি বললেন, ‘ও তো ভোর থেকে হাঁকডাক শুরু করেছে । আ-রে তপনকে ডেকে খবর দাও। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে—ও হয়তো ঘুম মারছে।’ এইরকম। সব সময় সব ব্যাপারে যে তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছি তা নয়। আমার মতও অকপটে প্রকাশ করেছি। সত্যজিৎ তাতে খুশিই হয়েছেন এই ভেবে যে আমি স্তাবকের দলে পড়ি না ।

বার্লিন ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রিত হল ‘কাবুলিওয়ালা’ । আমি, ছবি বিশ্বাস ও প্রযোজক অসিত চৌধুরী গেলাম সেখানে। দুদিন পরে হঠাৎ অরুন্ধতী মুখার্জি এলেন । কোন সুবাদে জানি না, কারণ ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবির সঙ্গে তাঁর কোনও সম্বন্ধ ছিল না। শুনলাম কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে আমাদের ডেলিগেশনের একজন করে পাঠিয়েছেন ।

‘কাবুলিওয়ালা’ টেকনিক্যালি খারাপ হলেও সমাদৃত হয়েছিল বার্লিনে । রবিশঙ্কর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের সম্মান পেলেন। ছবি বিশ্বাস পেলেন বিরাট সংবর্ধনা ।

ছবিদার দাপটও কম ছিল না। ফেস্টিভ্যালের আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সম্মেলনে একজন ছবিদাকে প্রশ্ন করলেন, ‘পৃথিবীর কোন অভিনেতার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেন ?’ ছবিদার উত্তর, ‘হু এপ্স্ দ্যান ব্যারি মোরস্ ? মানে শুধু জন ব্যারিমুর নয়, লায়োনেল ব্যারিমুরও । ছবিতে কাবুলিওয়ালার দাড়ি খুব খারাপ হয়েছিল । কারণ ছবিদা স্পিরিটগাম লাগাতে চাইতেন না । তাই ভেলিন দিয়ে দাড়ি লাগানো হত । ফলে, খুব বিশ্রী লাগত । তবুও ‘দ্য টাইম্‌স্‌’-এর চিত্র-সমালোচক লিখলেন, ‘হি ইজ সো গুড দ্যাট হি মেকস্ ইউ ফরগেট অ্যাবাউট হিজ বিয়ার্ড । *

রাজকাপুরও সেইসময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তো আমাকে প্রচণ্ড গালাগালি দিয়ে বললেন, ‘টেকনিক্যালি ভাল করলে এ ছবি একেবারে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ নিয়ে যেত, কেউ ঠেকাতে পারত না।’ রাজ বড় উদার অন্তঃকরণের মানুষ ছিলেন, সিনেমাই ছিল তাঁর জীবনের সব থেকে প্রিয়, তাঁর ধ্যানজ্ঞান। টাকা-পয়সা গ্রাহ্য করতেন না। যা রোজগার করতেন সবই খরচ করতেন ছবির জন্য। মনে হয় নিজের সঞ্চয় বলে তাঁর কিছুই ছিল না ।

পরিচালক তপন সিনহা রছিত ‘মনে পড়ে’ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *