ফিল্মি পার্সোনালিটি

‘Mone Pore’ an memoir by Tapan Sinha – তপন সিনহার স্মৃতিকথা ‘মনে পড়ে’

Tapan Sinha article

তবে নিয়মিত বিদেশি ছবি দেখা আর বই পড়া ঠিকই চলছিল । কখনও মেট্রো কখনও লাইটহাউসে প্রায়ই দেখতাম একটি লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আছে টিকিটের লাইনে । পরে জেনেছিলাম তাঁর নাম সত্যজিৎ রায় ।

একদিন বেলা দুটো থেকে রাত দশটা অব্দি একটা শিফ্‌ট পড়ল । রাতে কাজ করা ধাতে সইত না আমার । তবে বাণীদার বয়স হয়েছে, বাধ্য হয়ে রাজি হলাম । সন্ধ্যা ছটা বেজে গেল, পার্টির পাত্তা নেই। সবাই খুব বিরক্ত। এমন সময় হরেনবাবু হাতে একটা ছিপ নিয়ে বললেন, ‘মাছ ভাজা খাবেন ?’ বললাম, ‘আনুন ।’ স্টুডিয়োর পুকুরের একধার থেকে একটি ৫০০ ওয়াটের আলো ফোকাস করে অন্ধকারে ফেললেন হরেনবাবু। তার আগে ফেলেছিলেন একটু মশলা । একটু পরেই ছিপ ফেললেন । মুহূর্তে উঠে এল সের-দেড়েকের একটা রুই। আধঘণ্টার মধ্যে তিন-চারটে প্রায় একই সাইজের রুই ধরা হল । একটা করে মাছ ওঠে আর সোজা ক্যান্টিনে চলে যায়—সুকান্ত ভট্টাচার্যের মোরগের মতো। সেদিন পেটভরে মাছ ভাজা খাওয়া হল, সঙ্গে চা । শুধু একটা ব্যাপারই ভুলে গিয়েছিলাম, স্টুডিয়োর পুকুরে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ ।

পরের দিন বিরাট হইচই। অফিসে বাণীদার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল স্টুডিয়ো ম্যানেজারের। বাণীদা আমাকে বললেন, ‘তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। কই, আমার মাছ ভাজার শেয়ার কই ?’ একজন
দৌড়ে ক্যান্টিনের দিকে যেতেই বাণীদা বললেন, ‘দু-প্লেট এনো । একটা প্লেট স্টুডিয়ো ম্যানেজারকে দিতে হবে ।’

‘দি রিভার’ ছবি তুলতে কলকাতায় এলেন জাঁ রেনোয়াঁ। ক্যালকাটা মুভিটোনে একটি মেয়ে, প্যাট্রিসিয়ার টেস্ট নেওয়া হয়েছিল । পরে সে-ই ধারাভাষ্যের কাজ করে। রেনোয়াঁ সঙ্গে করে এনেছিলেন ওয়েস্টার্ন ইলেকট্রিকের তৈরি পৃথিবীর প্রথম ম্যাগনেটিক সাউন্ড রেকর্ডিং মেশিন । সঙ্গে ইংল্যাণ্ড থেকে চার্লস পুলটন এলেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে ।

কী কারণে জানি না, পুলটনের পছন্দ হল আমাকে। তাঁর সহকারী হিসাবে নিতে চাইলেন। এদিকে স্টুডিয়ো আমাকে ছাড়তে চায় না । যাই হোক, বাণীদা আমার পরিচালক হওয়ার পরিকল্পনা জানতেন সেই নিউ থিয়েটার্সের সময় থেকেই। তিনি ছ’মাসের ছুটির ব্যবস্থা করে দিলেন । নতুন উৎসাহে পুলটনের সঙ্গে লেগে গেলাম ম্যাগনেটিক মেশিন ফিট করার কাজে ।

শুটিং শুরু হল । স্ক্রিপ্‌ আগেই পড়েছি, রুমার গডনের লেখা বইটিও পড়া ছিল । একটা সাধারণ প্রেমের গল্প, তার ছত্রে ছত্রে ভারতবর্ষের ভুল ব্যাখ্যা । কিন্তু, গল্প যেমনই হোক, রেনোয়াঁর শিল্পীমনের পরিচয় পেতে শুরু করলাম তাঁর ডিটেল কাজের মধ্য দিয়ে। তাঁরই ভাইপো ক্লদ রেনোয়াঁ ছিলেন ছবির ক্যামেরাম্যান। অসাধারণ কাজ করছিলেন তিনি । কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা—মানে সাউন্ড ডিপার্টমেন্ট—ডোবাচ্ছিলাম । বিরাট টেকনিকালার ক্যামেরা লোড নিতে পারছিল না । পুলটনের আর ওয়েস্টার্ন ইলেকট্রিকের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে অনেক রাত কাজ করে শেষ পর্যন্ত বাধা দূর হল । কাজ নির্বিঘ্নেই চলছিল । এই সময় হঠাৎ মারা গেলেন আমার বাবা। আমি রেনোয়াঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলাম মায়ের কাছে । দু-তিন মাস পরে যখন কলকাতায় ফিরলাম, তখন ওঁরা কাজ শেষ করে চলে গেছেন ।

আমার স্বপ্ন, পরিচালক হওয়ার জন্য আমি এবার উঠেপড়ে লাগলাম । গত চার বছর হাতে-কলমে কাজ শিখেছি, সাহিত্য পড়া আমার নিত্যসঙ্গী । পড়েছি বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ লেখকের লেখা। লিখেছি ছোট ছোট অসংখ্য চিত্রনাট্য, আবার ছিঁড়েও ফেলেছি। এমন সময় ক্যালকাটা মুভিটোন থেকে আবার ডাক এল । বললাম, ‘মাস ছয়েক থাকতে পারি । আর সাউন্ড রেকর্ডিং ভাল লাগছে না।’ তা-ই ঠিক হল ।

হঠাৎ একদিন হলিউড থেকে ‘রিভার’ ছবির প্রযোজক জানালেন, প্যাট্রিসিয়ার কমেন্টারি নতুন করে রেকর্ড করতে পারলে খুশি হবেন । রাজি হয়ে গেলাম। প্যাট্রিসিয়া তখনও কলকাতাতে, এক মাসের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে বরাবরের মতো। সুতরাং ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি করতে হবে । স্টুডিয়ো ফ্লোরের মধ্যে কম্বল দিয়ে একটা ছোট্ট ঘর তৈরি করলাম আমি । বাণীদাও বাধা দিলেন না। প্যাট্রিসিয়াকে নিয়ে ওদের লোক এল । রেকর্ডিং করে পাঠিয়ে দিলাম। সাউন্ড প্রসেসিং হবে হলিউডে। যথাসময়ে রিপোর্ট এল, শব্দ ওভার-ড্যাড্ হয়েছে। বুঝলাম কম্বলের ঘর তৈরি করা ঠিক হয়নি । এও বুঝলাম, কাজটা ঠিকঠাক শিখিনি ।

একদিন বম্বে থেকে মুকুলদা এলেন। মুকুল বোস। তখন আমি কী একটা ছবির রেকর্ডিং করছি, নাম মনে নেই। দৌড়ে গিয়ে গাড়ি থেকে নামালাম তাঁকে । একটি পায়ে জন্ম থেকেই তাঁর কষ্ট ছিল ।

সাউন্ড ট্র্যাকে আমার পিছনে বসলেন মুকুলদা। বললেন, ‘বাণীবাবু তোমার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। তুমি নাকি খুব ভাল গান রেকর্ড করো । খুব ভাল ।’ ইতিমধ্যে ঘণ্টা বেজে উঠল, রিহার্সাল নিতে হবে। পিছনে মুকুলদা, আমার বুক কাঁপছে। পর পর দুটো রিহার্সাল নিয়ে মুকুলদাকে বললাম, ‘ঠিক আছে মুকুলদা ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ । বেশ তো ব্যালান্স করছ।’ রেকর্ডিং করে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীরকম লাগল, মুকুলদা ? ঠিক আছে তো ?’ বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে।’ আমিও ডিক্টোফোন দিয়ে বলে দিলাম, ‘ও.কে.’। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মুকুলদা বললেন, ‘তোমাকে দশের মধ্যে এক দিলাম ।’ আমি তো বিমূঢ় ।

এরপর মুকুলদা যা বললেন, তা চিরকাল মনে রেখেছি। বললেন, ‘সাউন্ড রেকর্ডিংও একটা আর্ট। সেটা শুধু গান রেকর্ডিং-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংলাপ রেকর্ডিং-এর মধ্যেও আনতে হবে । এই যে লম্বা শটি নিলে, তোমার প্রখর স্মৃতিশক্তির দরুন দুটো রিহার্সালে তোমার সংলাপ মুখস্থ হয়ে গেছে । তার প্রত্যেকটি নিচু স্বর তুলে নিচ্ছ, উঁচু স্বর চেপে দিচ্ছ। ফলে ডেলিভারির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রত্যেকটি শব্দ সুন্দরভাবে শোনা যাবে। কিন্তু রঙ থাকবে না। একেই বলে ফ্ল্যাট-কার্ভ রেকর্ডিং ।’

এবার সত্যিই মনে হল কিছুই শিখিনি ।

নিউ থিয়েটার্স, ক্যালকাটা মুভিটোনে আমার চলচ্চিত্র-জীবনের উদ্যোগ পর্ব। চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলাম পরিচালক হব বলে, শব্দযন্ত্রী হব বলে নয় । কিন্তু বহু বিদগ্ধ মানুষের সঙ্গ, শিক্ষা ও পরামর্শ পরিচালক হওয়ার পথে সাহায্য করেছিল আমাকে ।

স্টুডিয়োর মধ্যে একটা নিয়মানুবর্তিতা ছিল। যেদিন শুটিং থাকত না সেদিনও আমরা যে যার মেশিন খুলে ঝাড়পৌঁছ করতাম । কেউই এতটুকু সময় নষ্ট করত না। কাজ করার জন্য উপর থেকে কেউ বলতেনও না ।ভেবে নিতাম, এটা আমার কাজ, আমাকেই করতে হবে। এটা আমার করণীয় ।

এই চার বছরে স্টুডিয়োর মধ্যে কাউকে কোনও দিন মদ খেতে দেখিনি । তখন বেশিরভাগ মানুষই মদ ছুঁতেন না । কোনওরকম অসভ্যতাও দেখিনি । এখন প্রশ্ন জাগে, তা হলে সে-যুগে সমাজ সিনেমাকে একটা নিচু জায়গা ভাবত কেন ?

নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার প্রয়াত বীরেন্দ্রনাথ সরকারের রেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেননি । তিনি একাই প্রযোজনা করেন ১৩০টি ছবি । হয়তো বা বেশি। আজ নিউ থিয়েটার্স নেই বলে কোনও দুঃখ নেই ৷ হলিউডেও তো এম. জি. এম., ওয়ার্নার ব্রাদার্স, কলম্বিয়া, ইউনাইটেড আর্টিস্ট শুধু নামটুকু নিয়েই বেঁচে আছে । অন্য ভাবে, সে-কাহিনীও অন্য চলচ্চিত্রে কাজ করে এইটুকু বুঝেছি, চলচ্চিত্রের কিছুই দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হয় না । তার গাঁটছড়া বাঁধা টেকনোলজির সঙ্গে—টেকনোলজি পুরনো হলে সে পুরনো হবে, নতুন ধারায় এগোবে । সাহিত্য, সঙ্গীত, ভাস্কর্য, চিত্রকলার সঙ্গে এইখানেই চলচ্চিত্রের মূল তফাত ।

(পরিচালক তপন সিনহা রচিত ‘মনে পড়ে’ থেকে সংগৃহীত)

One thought on “‘Mone Pore’ an memoir by Tapan Sinha – তপন সিনহার স্মৃতিকথা ‘মনে পড়ে’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *