পুরোনো ফিল্ম

‘Shatranj Ke Khiladi'(1977)- Combination of Facts and Fiction; ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’

Shatranj Ke Khiladi

Satyajit Ray

সংস্কৃতি বা culture এর প্রতিফলন ঘটে মানুষের ব্যবহার, আচার-আচরণে, জীবন যাপনে, শিল্পে, সংগীতে ও তাদের সাহিত্যে। এই সমস্ত কিছু মিলেমিশেই গড়ে ওঠে সমাজ। যদিও জন্তু-জানোয়ারদেরও সমাজ থাকে কিন্তু তাদের সমাজে কৃষ্টি বা culture থাকে না। আর সেটাই পার্থক্য করে দিয়েছে মনুষ্য সমাজ আর পশু সমাজের মাঝখানে। এ প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধী(বাপুজী) বলেছেন,”Nation’s culture resides in the hearts and souls of its people”(জাতির কৃষ্টি বসবাস করে জনগণের হৃদয়ে এবং আত্মায়)। ঠিকই তো, একটি জনজাতি পরিচিত হয়ই তো তাদের সংস্কৃতি, শিল্পসাহিত্য, জীবন যাত্রার মাধ্যমে। তাদের সৃষ্টি কলার মাধ্যমে। সমাজ যদি দেহ হয় তবে culture অবশ্যই সেই সমাজের soul বা আত্মা, আর সাহিত্যকে বলা যেতে পারে তার ছায়া। কোনো অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার উপর নির্ভর করে রচিত সাহিত্যই সেই অঞ্চলের মানুষগুলোকে চেনায়, চেনায় তাদের সমাজ জীবনকে।

কতশত মৌখিক গল্পগাথা, লোককথা, ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা তৈরি হয় একটি সমাজের শিল্পীদের দ্বারা, যাতে প্রতিফলন ঘটে সেই সমাজের মানুষগুলোর আচার-আচরণ, রীতিনীতি, জীবন অভ্যাস এবং মানসিকতার। তুলে ধরে সমাজের বেশ কিছু গোপন সত্যি কথা কে। এবং তার সঙ্গে শিল্পীর নিজস্ব কল্পনার মিশেলে তৈরি হয় অপূর্ব কিছু সৃষ্টিকলা। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছেন,”Literature is nothing but carpentry. With both you are working with reality, a material just as hard as wood”(সাহিত্যরচনা ছুতোরি ছাড়া আর কিছুই নয়। দুজনেই দুটি কঠিন বস্তু নিয়ে কারবার করেন একটি কাঠ আর অপরটি বাস্তব।)

জীবন হলো নদীর মতো। আর নদী অনেক সময়ই তার নিজের চোরাস্রোতের কথা খেয়াল রাখেনা। সাহিত্যই হল সেই মাধ্যম যা জীবনের চোরাস্রোত কে তুলে ধরে। সময় বদলায়, বদলায় স্রোত, বদলায় গতিপথ। আর জীবনধারার এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে বদলা সাহিত্যও। বদলায় তার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। আবার বিজ্ঞানের আশীর্বাদে এই সাহিত্যকে তুলে ধরা যায় সেলুলয়েডের পর্দায়। দক্ষ পরিচালকের হাতে তৈরি সিনেমা যেমন হয় entertaining, তেমনই authentic। তবে চলচ্চিত্র অবশ্যই একটি নির্ভরশীল শিল্প মাধ্যম। তাকে নির্ভর করতে হয় সাহিত্য ও চিত্রকলার উপরে। সাহিত্যের চোখ দিয়ে সে সমাজের বাস্তব কে তুলে ধরে দর্শকের সামনে।

কোনো গল্প বা উপন্যাস adaptation এর মাধ্যমে সিনেমা করার ধারাটি কম জনপ্রিয় নয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এর বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ হল – Raja Harishchandra(1913), Mohini Bhasmasur(1913), Satyavan Savitri(1914), Lanka Dahan(1917), Kaliya Mardan(1919) হল কিছু পুরাণ গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবি। অপরদিকে, Guide(1965), Devdas(1955), Chokher Bali(2003), Kabuliwala(1961), Aparajito(1956), Anandamela(1952), Bandini(1963), Sahib Bibi Aur Gulam(1962) Choti Bahu(1971)— ছবিগুলি হল সমাজ সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা বিভিন্ন লেখকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত।

এত গৌরচন্দ্রিকার কারণ একটাই, আজ আমরা কথা বলব ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক সত্যজিৎ রায় নির্মিত অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি ছবি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি(Shatranj Ke Khiladi)’ ছবিটি নিয়ে। হিন্দিভাষী লেখক মুন্সি প্রেমচন্দের ওই একই নামে রচিত ছোট গল্প থেকে সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট এডাপ্ট করা হয়েছে। যদিও এতে সত্যজিৎ রায় তার নিজস্ব ভাবনা চিন্তা বা কল্পনাকেও খানিক মিশিয়ে দিয়েছেন যা ছবিটি নির্মাণের তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে হদিস দিতে পারে। গল্পে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রা দেখানো হয়েছে এবং প্রতিকীভাবে তা ভারতীয় রাজনীতি বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও কোথাও জুড়ে নিয়েছে। তাদের মনোভাব সংবেদনশীলতা ও আকাঙ্ক্ষাকে ফ্রেমের ছত্রছত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

‘Shatranj Ke Khiladi’ ছবির দৃশ্য

মুন্সি প্রেমচন্দের ছোট গল্প শুরু হচ্ছে, “ওয়াজিদ আলী শাহ কা সময় থা। লখনৌ বিলাসিতাকে রঙ্গোমে ডুবা হুয়া থা, ছোটে-বড়ে, আমির-গারিব সভি বিলাসিতা মে ডুবে হুয়ে থে।” খেয়াল করে দেখুন গল্পের প্রথম দুটি লাইনেই বলে দেয়া হচ্ছে গল্পের থিম, গল্পটি কেমন হতে চলেছে, সময়কাল, গল্পের চরিত্ররা কেমন হবে, সঙ্গে শহরের নামও থিমের সঙ্গে যথার্থ মানানসই। লখনৌ। রাজ-রাজড়ার শহর। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ ছিলেন অবোধ(Awadh)সাম্রাজ্যের দশম এবং শেষ নবাব। রাজকার্য ছাড়া সমস্ত দিকেই তিনি গুণী ছিলেন। শিল্পের খুব বড় সমঝদার ছিলেন। শিল্পের সমস্ত ধারাতেই তার অবাধ বিচরণ ছিল আর তার সময়ও কাটতো এসবের চর্চাতেই। ফলে রাজত্ব যদি এমন রাজার হাতে থাকে তবে আমরা সহজেই বুঝতে পারি প্রজাদের আচরণ কেমন হতে পারে। ফিল্মটির দুটি দিক কিন্তু প্রধান ভূমিকা অবলম্বন করেছে, এক,কম্পোজিশন ও দুই, মিজ অন সিন। আর এক্ষেত্রে অভিনেতাদের ভূমিকাই সর্বোচ্চ। তাদের মৌখিক অভিব্যক্তি, দৈহিক আচরণ, পজিশনিং, মুভমেন্ট, সংলাপ সব মিলিয়ে ছবির মিজ অন সিন ও কম্পোজিশনের উপরেই প্রকৃতপক্ষে চলচ্চিত্রটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর রয়েছে symbolism এর বহুল ব্যবহার। ছবিটি একইসঙ্গে বিনোদনমূলক এবং গভীর অর্থপূর্ণ।

‘Shatranj Ke Khiladi’ ছবির দৃশ্য

ছবি শুরু হচ্ছে অমিতাভ বচ্চন এর ভয়েস ওভারের মাধ্যমে যিনি গল্পের ন্যারেটর। একটি দাবার বোর্ডে ঘুঁটি সাজানো অবস্থায় রাজকীয় পোশাক পড়ে দুই খেলোয়াড় দাবার দুই দিকে বসে বড়ো আরামের সাথে আভিজাত্য ভঙ্গিতে দাবার চাল দিচ্ছেন। তাই তাদের সম্বন্ধে প্রথমেই বলা হচ্ছে, “ইন বাহাদুর সিপাহীসালার কি হাত তো দেখিয়ে, ভালে হি ইন হাতোমে আসলি হাতিয়ার না উঠায়ে হো, মগর কিস আন্দাজ সে ইস চৌকর ময়দানি জাং মে আপনি ফৌজে আগে বড়া রাহা হে।” এই খেলোয়াড় দুজন হলেন মির্জা সাজ্জাদ আলী(সঞ্জীব কুমার) এবং মীর রওশন আলী(সাইদ জাফরি) যারা দুজনেই লখনৌয়ের জায়গীরদার অর্থাৎ, অর্থ রোজগারের কোন চিন্তাই তাদের করতে হয় না। সংসারের কোন কর্তব্য বা দায়িত্বের প্রতিও তারা সচেতন নন, তারা কেবল খেলেন দাবা বা শতরঞ্জ। আসলে এই দুটি চরিত্র হল অনেকটা সেই গুহায় আগে আগে মশাল ধরে যে হাটে সেই ব্যক্তির মত অর্থাৎ পথপ্রদর্শক। এই দুটি চরিত্রের দাবা খেলার দৃশ্যের সাথে ন্যারেটিভ, প্রথম থেকেই আমাদের গল্পের ব্যাপারে hint দিতে থাকে। দাবার বোর্ডটি ও তার ঘুঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রপস। দাবার বোর্ডটি অবশ্যই যথেষ্ট দামি এবং রাজকীয় অর্থাৎ এখান থেকে এটা ধারণা করা যেতে পারে ছবির মূল লড়াই কোন নিছক সাধারণ মানুষের লড়াই বা মারামারি নয়, বরং তা হবে অনেক বেশি আভিজাত্যপূর্ণ লড়াই যেখানে রক্তপাত জীবনহানি ছাড়াই অনেক কিছু ঘটবে। ঘুটিগুলোর মধ্যে তাৎপর্য রয়েছে। একদিকের ঘুঁটি সাদা এবং আরেকদিকে লাল এবং ন্যারেটিভে বলা হচ্ছে, “ইয়েহি হ্যায় সফেদ ফৌজ কি বাদশা অর ইন পর লাল ওয়াজির হামলা কি তাক পে হে”, অর্থাৎ প্রতীকী ভাবে অনেক কিছুই বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে ছবির প্রথম দৃশ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *